Wednesday, June 24, 2020

নতুন বিজ্ঞাপন এজেন্সীর যাত্রা শুরু

নতুন বিজ্ঞাপন এজেন্সী ফ্রাব অ্যাডভার্টাইজিং -এর যাত্রা শুরু করল সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা কমিটি।  নির্বাহী পরিচালক হিসেবে যোগদান করেছেন মো. রফিকুল ইসলাম রিপন। তিনি বলেন, বিজ্ঞাপন এজেন্সীর ব্যবসা করে মাসে লক্ষ লক্ষ টাকা আয় করতে পারেন। চাই সফল একটি উদ্যোগ গ্রহণ।  বন্ধুরা স্বাগতম আপনাদের সকলকে। 

আপনি চাইলেও সুন্দর একটি ক্যারিয়ার গড়তে পারেন। এই ব্যবসা করার জন্য খুব বেশী পুজিঁর প্রয়োজন পড়বে না। তবে আপনাকে ভাল যোগাযোগ রক্ষা করে চলতে হবে। আপনাকে ব্যবসায়ের পরিধি বাড়াতে সক্ষম হতে হবে। সফলতার জন্য আপনার যোগাযোগ ও ব্যবহারই এ ব্যবসায়ের সবচেয়ে বড় পুঁজি।

উৎপাদিত পণ্যের প্রচারের জন্য বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত মাধ্যম হচ্ছে বিজ্ঞাপন। এবং বড় বড় কোম্পানী গুলো তাদের পণ্যের মূল্যের প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ বিজ্ঞাপন খাতে ব্যয় করে থাকে। টেলিভিশন, রেডিও, পত্রিকা, মাগ্যাজিন, বিলবোর্ড এর সাথে বর্তমানে অনলাইনে বিজ্ঞাপন দেওয়ার আরও একটি নতুন ক্ষেত্র তৈরী হয়েছে।

বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলো সাধারনত তৃতীয় পক্ষ হিসেবে কাজ করে থাকে। এর জন্য আপনাকে একটা বা দুইটা রুমের অফিস রুম ভাড়া নিতে হবে। আপনি নিজেই অথবা দু-চার জন কর্মী নিয়োগ দিয়েই শুরু করতে পারবেন এ ব্যবসাটি। এজন্য আপনাকে অফিস ভাড়ার অগ্রিম এবং অফিস সজ্জা বাবদ সামান্য অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে। মিডিয়া পাড়ায় এ ধরনের ব্যবসার ব্যপক সুযোগ রয়েছে। এর বাইরেও বিভাগীয় বা জেলা পর্যায়ে অফিস নিয়ে শুরু করতে পারবেন এ ব্যবসা।

যারা বিভিন্ন টেলিভিশন, রেডিও, পত্রিকা, মাগ্যাজিন বিলবোর্ড বা অনলাইনে বিজ্ঞাপন প্রচার করতে ইচ্ছুক তাদের সাথে যোগাযোগ করুন। তাদের কাছ থেকে বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট মাধ্যমে প্রচারের ব্যবস্থা করাই হচ্ছে আপনার কাজ। আর এর মাধ্যমে আপনি পাবেন কমিশন। যেখান থেকে আসবে আপনার আয়। সরকারী বেসরকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিজ্ঞাপন প্রচারের কাজ পাওয়ার পাশাপাশি আপনি প্রেস রিলিজ প্রচারের কাজও পাবেন। যেখান থেকেও আপনার আয় হবে বড় একটা অর্থের।

এ জাতীয় প্রতিষ্ঠান চালানোর জন্য আপনাকে অবশ্যই বিজ্ঞাপন প্রচারকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে সর্তকতার সাথে যোগাযোগ রাখতে হবে। তাদের বিজ্ঞাপনের মূল্য সম্পর্কে আপনার পূর্ন ও সঠিক ধারনা থাকতে হবে। সে অনুযায়ী আপনি ব্জ্ঞিাপন সংগ্রহ করে প্রচারের ব্যবস্থা করতে পারলেই আপনার ব্যবসায়ের দ্রুত প্রসার ঘটাতে পারবেন। এবং প্রচুর প্ররিমান আয়ও করতে পারবেন। যত বেশী পরিমান বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করে প্রচারের ব্যবস্থা করতে পারবেন আয়ও তত বাড়বে।

আমি আপনাদের আবারও স্মরন করিয়ে দিতে চাই এ ব্যবসায়ের সবচেয়ে বড় পুঁজি হচ্ছে যোগাযোগ, সম্পর্ক তৈরী ও ব্যবহার। ধৈয্য সহকারে এগিয়ে যেতে পারলে এ ব্যবসায় আপনি খুব সহজেই পেতে পারেন সফলতা।

লাইক দিয়ে পেইজের সাথে থাকুন ও আপনার বন্ধুদের ইনভাইট করুন পেইজে। এবং এ বিষয় সম্পর্কে অন্যদের জানাতে পোষ্টটি শেয়ার করতে পারেন।  

Tuesday, June 23, 2020

একটি বিজ্ঞাপন সংস্থা ক্রিয়েটিভ বিভাগ

যদিও প্রতিটি বিভাগ একটি বিজ্ঞাপন সংস্থাতে অপরিহার্য, সৃজনশীল বিভাগ এটি সংজ্ঞায়িত করে। একটি বিজ্ঞাপন সংস্থা একটি পণ্য আছে, এটা সৃজনশীল কাজ। এবং যে সৃজনশীল বিভাগে কাজ (এবং প্রায়ই বাস) প্রতিভাধর মানুষের দ্বারা সম্পন্ন করা হয়।

মুদ্রণ বিজ্ঞাপন এবং সরাসরি মেইল ​​থেকে সবকিছু, বিজ্ঞাপন সম্প্রচার, ওয়েবসাইট এবং গেরিলা প্রচারাভিযানের এখানে ধারণা করা হয়। সৃজনশীল বিভাগ ছাড়া, কোন সংস্থা নেই। আসলে, অনেক মানুষ সৃজনশীল বিভাগটিকে মেশিনের ইঞ্জিন হিসাবে বিবেচনা করে, যদিও, অন্য বিভাগগুলি এটির সমর্থন না করেই কোনও কাজ করবে না।

কে সৃজনশীল বিভাগে কাজ করে?
যদিও এটি সংস্থা থেকে সংস্থা থেকে সামান্য পরিবর্তিত হয়, তবে সৃজনশীল বিভাগ সাধারণত অক্ষরের একই গুচ্ছ গঠিত হয়। এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে:

সৃজনশীল পরিচালক (গুলি)

সৃজনশীল মুষ্টি যদি কারো সাথে থাকে তবে এটি সৃজনশীল পরিচালক (সিডি)। দলটি যে কাজ করছে তা নিশ্চিত করার জন্য এটি তার কাজ, সংক্ষিপ্ত এবং নির্দিষ্ট মানের। সৃজনশীল পরিচালকও সিদ্ধান্ত নেয় যে কোন দলগুলি কোন প্রকল্পগুলিতে কাজ করবে, কোন সময় এটি সমাধান করতে হবে, এবং এই অভিযানের পরিকল্পনাকারী দলের পাশাপাশি ক্লায়েন্টের কাছে কাজটি উপস্থাপন করতে থাকবে।

অনুষ্ঠানটি উত্থাপিত হলে, সিডিটি কোনও সমস্যাতে সহায়তা করতে পারে, বা অন্য কোনো সৃজনশীল ব্যক্তি যদি এটি সমাধান করতে পারে তবে সমাধান করতে পারে। এই কারণেই সিডিটিকে ক্রমাগত সৃজনশীল বিভাগে "প্রতিরক্ষা শেষ লাইন" বলা হয়।

প্রকৃতপক্ষে একটি কপিরাইটার বা শিল্প পরিচালক (এবং কখনও কখনও একজন ডিজাইনার বা অ্যাকাউন্ট নির্বাহী) সৃজনশীল পরিচালক কাজ পরিচালনা করবেন এবং সফল হলে সংস্থাটি আর্থিক এবং সমালোচনামূলক সাফল্য অর্জনে সহায়ক হবে। ডেভিড অ্যাবট, বিল বার্নব্যাচ, লি ক্লো এবং সম্প্রতি, অ্যালেক্স বোগুস্কি মত ক্রিয়েটিভ পরিচালক, এই ভাবে সংস্থাগুলি আকৃতির। সহযোগী সৃজনশীল পরিচালক, সৃজনশীল পরিচালক, সিনিয়র সৃজনশীল পরিচালক এবং অবশেষে নির্বাহী সৃজনশীল পরিচালক এর সাথে শুরু হতে কিছু সংস্থার সৃজনশীল পরিচালক বিভিন্ন স্তরের থাকবে।

Copywriters

এটির আকার, ক্লায়েন্ট বেস এবং এটি যে ধরণের প্রকল্পগুলিতে কাজ করে তার উপর নির্ভর করে বিজ্ঞাপন সংস্থাটিতে কপিরাইটারের অনেক স্তর রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, একটি সংস্থা যা সরাসরি বিপণন ও ওয়েব সামগ্রীর উপর মনোযোগ দেয় তার প্যাকেজিং এবং পয়েন্ট বিন্দুতে দৃষ্টি নিবদ্ধ করা এমন সংস্থার তুলনায় কর্মীদের বেশি লেখক থাকবে। কপিরাইটারটি সাধারণত শিল্প পরিচালক বা ডিজাইনারের সাথে কাজ করবে, যা 1950-এর দশকের শেষ দিকে ডিডিবি বিল বিলব্যাচ দ্বারা পরিকল্পিত হয়েছিল। দুঃখজনকভাবে, এই মডেলটি আজকাল কম জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, এজন্য কর্মীদের কাজের উপর ভিত্তি করে ফ্রিল্যান্সারদের সাথে কর্মীদের আপ বা ডাউন হিসাবে।

রানগ কম প্রান্তে জুনিয়র কপিরাইটার হয়। এক বছর বা তারপরে, সেই অবস্থান কপিরাইটার, তারপরে সিনিয়র কপিরাইটার, এবং তারপরে সৃজনশীল পরিচালক / কপি সহযোগী হয়। জুনিয়র লেখকরা নিম্ন-স্তরের প্রকল্পগুলিতে কাজ করবে এবং তাদের ফুটন্ত খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত আরও সিনিয়র কর্মীদের দ্বারা প্রশিক্ষিত হতে হবে। কপিরাইটারগুলি একেবারে অনলাইন বিজ্ঞাপন এবং ব্যানারগুলি থেকে সম্পূর্ণভাবে ফুটে উঠেছে এমন একত্রিত প্রচারাভিযানে। এবং, তারা শুধু সেই লোক নয় যারা শব্দ নিয়ে আসে। কপিরাইটাররা সাধারণত খুব কৌশলগত, সৃজনশীল চিন্তাবিদ, আর্ট পরিচালক এবং ডিজাইনার হিসাবে অনেক চাক্ষুষ ধারনা নিয়ে আসছেন।

শিল্প পরিচালক

কপিরাইটারদের মতই, জুনিয়র থেকে সিনিয়র পর্যন্ত এবং অবশেষে ACD / AD ভূমিকা সংস্থার মধ্যে শিল্প পরিচালক স্তর রয়েছে। একটি শিল্প পরিচালক কপিরাইটার এবং ডিজাইনার পাশাপাশি একটি প্রচারণা চালাতে কাজ করে, এবং লেখক হিসাবে একটি সৃজনশীল চিন্তাবিদ হিসাবে অনেক। যদিও এটি একটি শিল্প পরিচালক শিরোনামে "শিল্প" শব্দটি আছে তবে উল্লেখ করা উচিত যে অঙ্কন দক্ষতা প্রয়োজন হয় না। এটি সৃজনশীল সমস্যা সমাধানের একটি কাজ, অন্য লোকেদের দ্বারা সম্পাদন করা যেতে পারে।

যখন শিল্প পরিচালক কোনও প্রকল্পে নিয়ে যায়, তখন তিনি সৃজনশীল পরিচালক সহ প্রচারের চেহারা এবং অনুভূতি স্থাপন করতে হস্তক্ষেপ করবেন। এই দিনগুলিতে, বেশিরভাগ শিল্প পরিচালকের চমৎকার ম্যাক দক্ষতা রয়েছে, কিন্তু আবার, এটি সর্বদা প্রয়োজনীয় নয়। সংস্থার শীর্ষ ডিজাইনারদের একটি দল থাকলে, শিল্প পরিচালক তাদের দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে নির্দেশ দিতে পারেন।

পরিকল্পকরাগ্রাফিক ডিজাইন, ওয়েব ডিজাইন এবং এমনকি পণ্য ডিজাইনের দক্ষতা সহ অনেক ধরণের ডিজাইনার রয়েছে। যাইহোক, বেশিরভাগ সংস্থাগুলিতে কর্মীদের সাথে শিল্প পরিচালকদের এবং কপিরাইটারদের সহায়তা করার জন্য এবং কোনও ধারণা দলটির প্রয়োজন ছাড়াই বিশুদ্ধ নকশা প্রয়োজন এমন কাজগুলিতে কাজ করার জন্য কর্মীদের গ্রাফিক ডিজাইনার থাকবে। ডিজাইনাররা খুব মূল্যবান, কারণ তারা পরবর্তী স্তরে ধারনা নিতে পারে এবং সমাপ্ত কাজটিকে একটি পোলিশ দেয় যা সৃজনশীল দল যোগ করতে পারে না। ছোট সংস্থাগুলির মধ্যে, ডিজাইনাররা স্টাফ হতে পারে না, তবে প্রয়োজন অনুসারে ফ্রিল্যান্সার হিসাবে ভাড়া দেওয়া হবে, অথবা ডিজাইন স্টুডিওতে কাজ করবে যাদের পরিষেবাগুলি সময়ে সময়ে অনুরোধ করা হয়।

ওয়েব ডেভেলপারগণ

ডিজাইনার এবং শিল্প পরিচালক পাশাপাশি কাজ ওয়েব ডেভেলপারদের হয়। ডিজিটালে এত বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে, এটি একটি ভূমিকা যা গত দশকে সংস্থাটির কাছে মূল্যবান হয়ে উঠেছে। কিছু ডিজিটাল সংস্থার ডেভেলপারদের একটি সম্পূর্ণ দল থাকবে, অন্যরা কেবল প্রচারের ডিজিটাল অংশগুলিতে সহায়তা করার জন্য কয়েকজন কর্মী থাকবে। এটি অনলাইন বিকাশ ডিজাইন করতে সহায়তা করার জন্য ওয়েব ডেভেলপারদের কাজ, এটি কোড, এটি সংশোধন করতে এবং কখনও কখনও এটি বজায় রাখতে সহায়তা করে। তাদের চমৎকার UX (ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা) দক্ষতা থাকা উচিত এবং স্পষ্ট নেভিগেশান এবং ব্যবহারকারী-বান্ধব প্ল্যাটফর্মগুলির দক্ষতা অর্জন করা উচিত।

উৎপাদন শিল্পীউৎপাদন শিল্পীদের (প্রায়ই) প্রচারাভিযান গ্রহণ এবং মুদ্রণ জন্য তাদের প্রস্তুত করার কৃতজ্ঞ কাজ আছে। এতে প্রিন্টিং প্রেসের জন্য ফাইলগুলি সেট করা, একাধিক প্রকাশনাগুলির জন্য এক বিজ্ঞাপনের সংস্করণ তৈরি করা এবং বিদ্যমান প্রচারাভিযানের আপডেটগুলি তৈরি করা হবে। যদিও এটি এমন একটি কাজ নয় যা অনেক জটিল চিন্তাভাবনার প্রয়োজন হয় তবে এটি বিস্তারিত এবং একটি অধ্যবসায়ী মনোভাবের উপর মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজন হয়।

স্কেচ / স্টোরিবোর্ড শিল্পী

কিছু সংস্থা, বিশেষত যারা টিভি এবং আউটডোর বিজ্ঞাপনগুলি অনেকগুলি করে, তাদের স্কেচ শিল্পী বা স্টাফদের "কব্জি" থাকবে। এটি এমন কেউ যে দ্রুত এবং দক্ষতার সাথে টিভি অঙ্কুরের জন্য স্টোরিবোর্ডগুলি বা চিত্র প্রচারের জন্য স্কেচ করতে পারেন। অতীতে, স্কেচ শিল্পী পেন্সিল এবং মার্কারের সাথে কাজ করতেন, কিন্তু এই দিনগুলিতে এটি দ্রুত এবং সহজে অনেকগুলি Wacom ট্যাবলেটের মতো কিছু ব্যবহার করতে পারে। এই ভাবে, ক্লায়েন্টের প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে ডিজিটাল স্কেচগুলি বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত এবং রঙ করা যায়।

Monday, June 22, 2020

বিজ্ঞাপনী সংস্থায় ক্যারিয়ার

আপনি যদি নিজের সৃজনশীল দক্ষতাকে সবার সামনে তুলে ধরতে চান, তাহলে বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কাজ করা অন্যতম সেরা নির্বাচন হতে পারে। অবশ্য এ ফিল্ডে কাজ করতে হলে আপনাকে শুধু শিল্পমনা হলেই চলবে না; বরং ক্লায়েন্টের চাহিদা অনুযায়ী যে পণ্য বা সার্ভিসের প্রচারণা চালাবেন, সে পণ্য বা সার্ভিস সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখতে হবে। প্রচুর চাপের মধ্যেও ঠিক সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে পারলে আরো ভালো। জেনে নিন বাংলাদেশের কোন বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলোতে আপনার কাজের সুযোগ রয়েছে।

অগিলভি অ্যান্ড ম্যাথার – বাংলাদেশ (Ogilvy and Mather)

বহুজাতিক নামকরা এ বিজ্ঞাপনী সংস্থা বাংলাদেশের স্থানীয় শাখার মাধ্যমে সার্ভিস দিয়ে থাকে। অগিলভি অ্যান্ড ম্যাথারে কাজের সুযোগঃ সামগ্রিক ব্র্যান্ডিংয়ের উপর সংস্থাটি কাজ করে। কাজেই ডাটা অ্যানালিটিক্স থেকে শুরু করে গণসংযোগ – সব ধরনের কাজের সুযোগ পাবেন এখানে। তবে এর জন্য আধুনিক ব্র্যান্ডিংয়ের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে ভালো জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।

টিবিডব্লিউএ/বেঞ্চমার্ক (TBWA\Benchmark)

এ প্রতিষ্ঠান টিবিডব্লিউ ওয়ার্ল্ডওয়াইডের একটি অংশ। স্থানীয় বা আন্তর্জাতিক – যেকোন ব্র্যান্ডের সাথে এটি কাজ করে থাকে। গ্রামীণফোন, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, অ্যাপোলো হাসপাতাল, পিৎজা হাট আর কেএফসির মতো পরিচিত ব্র্যান্ড রয়েছে এর ক্লায়েন্ট তালিকায়।

টিবিডব্লিউএ/বেঞ্চমার্কে কাজের সুযোগঃ বিজ্ঞাপন, যোগাযোগ, ইভেন্ট ব্যবস্থাপনা আর মিডিয়া – টিবিডব্লিউএ/বেঞ্চমার্ক এ ক্ষেত্রগুলোর উপর জোর দেয়। শুধু স্পোর্টস মার্কেটিং নিয়ে তাদের আলাদা একটি শাখা রয়েছে, যা বাংলাদেশের বড় ক্রিকেটারদের নিয়ে কাজ করে। আপনি যদি খেলাধুলার ভক্ত হয়ে থাকেন, তাহলে এ ব্যাপারটি বিবেচনায় রাখতে পারেন।

গ্রে অ্যাডভার্টাইজিং (Grey Advertising)

২০১৪ সালের আইসিসি ট্রফির সময় ফ্ল্যাশ মব আমাদের দেশে খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলো। এর পেছনে রয়েছে গ্রে অ্যাডভার্টাইজিংয়ের অবদান। অ্যাক্সেস টু ইনফরমেশন (a2i), কোকা-কোলা, সিপি (CP) বা গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইনের (GSK) মতো ক্লায়েন্টের কাজ করেছে দেশের বিজ্ঞাপন ফিল্ডের বড় এ নাম।

গ্রে অ্যাডভার্টাইজিংয়ে কাজের সুযোগঃ অন্যান্য সব বিজ্ঞাপনী সংস্থার মতো গ্রে অ্যাডভার্টাইজিংও বিভিন্ন ক্ষেত্র নিয়ে কাজ করে থাকে। তবে শপিং নিয়ে তাদের বিশেষ সার্ভিস রয়েছে।

“thinkers, dreamers and innovators who can put ideas into motion that leads to results” – নিজেদের ওয়েবসাইটে পছন্দের কর্মীকে এভাবেই বর্ণনা করেছে তারা। যেকোন সময় আপনি নিজের সিভি জমা দিতে পারেন তাদের কাছে।

অন্য কোন বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কাজ করা যায়?

ফ্রাব অ্যাডভার্টাইজিং (FRUB ADVERTISING) 

নতুন একটি বিজ্ঞাপন এজেন্সী। পর্যাপ্ত কাজের সূযোগ রয়েছে। এ সংস্থা বাংলাদেশের বিজ্ঞাপন শিল্পে সবেমাত্র যোগদান করেছে। আপনি নতুন ক্যরিয়ার গড়তে চাইলে অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য ফ্রাব অ্যাডভার্টাইজিং -এ যোগদান করতে পারেন।  

তুলনামূলকভাবে নতুন ও সম্পূর্ণ দেশী প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ দিয়ে বিজ্ঞাপন জগতে জায়গা করে নিচ্ছে। যেমন, ব্র্যান্ডভেন্ট (BrandVent) তাদের ক্লায়েন্টদের জন্য সেলস ও ট্রেড মার্কেটিং ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেয়।

আপনি যদি ডিজিটাল মার্কেটিং নিয়ে আগ্রহী হয়ে থাকেন, তাহলে ম্যাগনিটো ডিজিটাল (Magnito Digital) আপনার জন্য ভালো জায়গা হতে পারে। ডিজিটাল কন্টেন্ট ও ক্যাম্পেইনের জন্য তারা বেশ পরিচিত।

গ্রাফিক ডিজাইন নিয়ে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করলে জানালা বাংলাদেশে (Zanala Bangladesh) যোগ দেবার চেষ্টা করতে পারেন। তাদের ডিজাইন পোর্টফোলিওতে লোগো আর কার্ডসহ সব ধরনের ব্র্যান্ডিং উপকরণ রয়েছে।

আপনার ব্যক্তিগত পছন্দ কোনটি?

বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কাজ করা একই সাথে চ্যালেঞ্জিং ও আকর্ষণীয় এক অভিজ্ঞতা। তবে কোন জায়গায় কাজ নেবার আগে এর ভালো-মন্দ দিকগুলো চিন্তা করে নেবেন। আর সবসময় নিজের দক্ষতাকে বাড়াতে থাকুন – সেটা শৈল্পিক হোক বা কল্পনাকে বাস্তব বিজ্ঞাপনে রূপ দেবার ক্ষমতা হোক!

বিজ্ঞাপন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত এ মুহূর্তে ঠিক নয়

বিশ্বের সঙ্গে আমাদের দেশেও করোনার আঘাত পড়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা লাখ ছাড়িয়েছে। মৃতের সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছেই। স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, সেনাবাহিনী, পুলিশসহ গণমাধ্যমকর্মীরাও কাজ করছেন। জীবন ও জীবিকা সচল রাখার জন্য সরকার যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, সেসব দেশবাসীকে জানাতে ফ্রন্টলাইনের অন্যতম কাজ করছে মিডিয়া। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার তিন শতাধিক সংবাদকর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। মারাও গেছেন অনেকে। সংবাদকর্মীরা ঝুঁকি নিয়েই কাজ করছেন। সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মূল আয় বিজ্ঞাপন। হোক সেটা সরকারি কিংবা বেসরকারি খাতের। 

করোনার মন্দার কারণে বিজ্ঞাপনের প্রবাহ কমে গেছে। পাশাপাশি যেসব বকেয়া বিল রয়েছে তার প্রাপ্তিও এখন অনিশ্চিত। সে কারণে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া আর্থিক সংকটে পড়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে চলমান রাখায় যেমন সংকট তৈরি হচ্ছে, তেমন কর্মীদেরও সংকট তৈরি হচ্ছে। অনেক পত্রিকায় কর্মী ছাঁটাই করা হচ্ছে। বেতন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। অনেকটি বন্ধ হয়ে গেছে। সংকটকালে গণমাধ্যমকর্মীরা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। এ মুহূর্তে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। কীভাবে মিডিয়াকে টিকিয়ে রাখা যায় সে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এখানে মিডিয়া মালিক, সাংবাদিক, কর্মচারী যারা আছেন তাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একসঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একে অন্যের পাশে দাঁড়াতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আগে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ সরকার করোনার শুরু থেকে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে তা জাতিকে জানিয়েছে মিডিয়া। 

মিডিয়া যদি না থাকে বা দায়িত্ব পালন করতে না পারে তাহলে রাষ্ট্র বলুন, সরকার বলুন, আমাদের সমাজ বলুন কেউই জয়ী হতে পারব না। মিডিয়ার গুরুত্ব বিবেচনা করে বিভিন্ন প্রণোদনা দিয়ে, সাহস দিয়ে টিকিয়ে রাখতে হবে। যেসব বিজ্ঞাপনের বিল বকেয়া রয়েছে, তার ছাড় দেওয়া হলে পত্রিকা ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া যে সংকটে পড়েছে তা কিছুটা হলেও উপকৃত হবে। টিকিয়ে থাকতে পারবে। 
ডিজিটাল আইনের যথেচ্ছ ব্যবহার কাম্য নয়। সাংবাদিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকতে হবে। আবার সাংবাদিকতার স্বাধীনতা মানেই স্বেচ্ছাচারিতা নয়, যা খুশি লিখে দেব তা নয়। দুই দিকেই একটা সীমা থাকবে। সাংবাদিকতার স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপের যেমন বিরোধিতা করি, সেটা যার পক্ষ থেকেই আসুক না কেন। আবার সাংবাদিকতার বস্তুনিষ্ঠতা ত্যাগ করে দায়িত্বজ্ঞানহীন সংবাদ প্রকাশ, ব্যক্তিকে আঘাত করে, সমাজে শান্তি বিঘ্নিত হতে পারে এমনটাও করা উচিত নয়। 

যখন তখন যাকে তাকে গ্রেফতার হয়রানি কাম্য নয়। ডিজিটাল আইন যখন হয় তখন আমরা এর প্রতিবাদ করেছিলাম। সে সময় বলা হয়েছিল, মামলা হলেই সাংবাদিকদের গ্রেফতার করা হবে না। কোনো সাংবাদিকের নামে মামলা হলে সেটা আগে শীর্ষ মহল অর্থাৎ আইজিপি পর্যায়ে অনুমতি নিয়েই পদক্ষেপ নেয়া হবে। আমরা এখনো মনে করি এ নির্দেশনাটি ফলো করা প্রয়োজন আছে। কোনো সাংবাদিক যদি একটু বাড়াবাড়ি করেও থাকেন, তিনি কিন্তু অপরাধী চক্র নন। যদি কেউ অপরাধ করেন, অবশ্যই বিচার করা যাবে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ধরে নিয়ে এসে যা করা হচ্ছে বা অন্য সাংবাদিকদের মধ্যে পেশাগত দায়িত্ব পালনে ভীতি সৃষ্টি করছে- এটা কাম্য নয়। 

ভীতি ও ভয়ের মধ্য দিয়ে বস্তুনিষ্ঠ ও সাহসী সাংবাদিকতা হয় না। কেউ যদি আইনের বরখেলাপ করেন, তাকে গ্রেফতারের আগে অনুমতি নিতে হবে। তাহলে তৃণমূলে যে বাড়াবাড়ি চলছে তা কমে যাবে। ব্যাংকের মালিক যারা আছেন, তারা একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এ মুহূর্তে পত্রিকা ও টেলিভিশনে কোনো বিজ্ঞাপন দেবেন না। 

বিজ্ঞাপন দেওয়া না দেওয়া তাদের ব্যাপার। কিন্তু এ মুহূর্তে তাদের এ সিদ্ধান্তটা ঠিক নয়। ব্যাংক একটি সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান। গ্রাহককে যে সেবা দেবেন তা তো জানাতে হবে। জানাতে হলে অবশ্যই বিজ্ঞাপন দিতে হবে।

-ইকবাল সোবহান চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর সাবেক তথ্য উপদেষ্টা ও সাংবাদিক নেতা।

Sunday, June 21, 2020

বিজ্ঞাপন নিয়ে যত ভাবনা

বিজ্ঞাপন বিভিন্ন প্রচার মাধ্যম ব্যবহার করে পণ্য ও সেবা কিংবা নতুন ধারণা সম্পর্কে ভোক্তা বা ব্যবহারকারী সকলকে জানানোর একটি ব্যবস্থা। এটি শুধু জানানোতেই সীমাবদ্ধ থাকে না, সম্ভাব্য ক্রেতা বা ব্যবহারকারীদের কাছে এসবকে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করে, সেগুলি ক্রয়ে উদ্বুদ্ধ, এমনকি কখনও কখনও প্ররোচিতও করে। আর এই কাজটি করে থাকে বিক্রেতা তথা উৎপাদনকারী নিজে, তার প্রতিনিধি কিংবা বিপণনে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি। যে মাধ্যমেই বিজ্ঞাপন প্রচারিত হোক, এর জন্য বিজ্ঞাপনদাতাকে ব্যয় বহন করতে হয়। বিজ্ঞাপনের ধরন নির্বাচন, তার জন্য কথা বা ছবি সাজানো এবং তার উপস্থাপনা, প্রকাশনা, প্রচারণা ইত্যাদি অতীতে ব্যক্তিগতভাবে বা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের নিজ স্থাপনা ও জনবলের সাহায্যে সম্পাদিত হলেও এখন এসব একটি সুসংগঠিত পেশার কাজ এবং এসবের জন্য আছে ছোটবড় বিভিন্ন বিশেষায়িত বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠান।

বাংলাদেশে বিজ্ঞাপনের অস্তিত্ব প্রাচীন হলেও অল্পদিন আগেও এর প্রসার ছিল সীমিত। স্বাধীনতার পূর্বে বিজ্ঞাপন শিল্প বলতে তেমন কিছু ছিল না। শিল্প কারখানার ব্যাপক বিকাশ না ঘটায় বিজ্ঞাপনের প্রয়োজনীয়তাও তেমন প্রকট ছিল না। ১৯৬৭ সালে ঢাকায় বিটপী, ইস্ট এশিয়াটিক ও ইন্টারস্প্যান নামে তিনটি বিজ্ঞাপনী ফার্ম প্রতিষ্ঠা লাভ করে। লিভার ব্রাদার্স এবং সমস্থানীয় খুবই সীমিতসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের পণ্য বিপণনের বিজ্ঞাপনই ছিল এদের প্রধান ব্যবসা। এ পরিপ্রেক্ষিতে বলা হয়, বাংলাদেশে বিজ্ঞাপন শিল্পের বিকাশ বলতে যা-কিছু তার সবই ঘটে ১৯৭১-এর দেশ স্বাধীন হবার পরবর্তী সময়কালে। 

বর্তমানে বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেয় এমন নিবন্ধিত বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৫০ এবং অনুমান করা হয় যে সংগঠিত ও অসংগঠিত উভয় খাত মিলে দেশে মোট বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠান আছে প্রায় ৫০০। তবে প্রচারিত বিজ্ঞাপনের ৭০% ভাগই যায় বড় বড় বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এবং বাজারে আধিপত্যের ক্রম-অনুযায়ী সাজালে হাতে গোণা এসব বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আছে অ্যাডকম, এশিয়াটিক, বিটপী, ইউনিট্রেন্ড, গ্রে, ইন্টারস্পিড, পপুলার, ম্যাডোনা এবং মাত্রা। ১৩% ভাগ বিজ্ঞাপনের প্রচার হয় অন্যান্য বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আর বিজ্ঞাপনের বাকি অংশ (১৭%) প্রচার করে উৎপাদনকারী/বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান নিজে, তাদের নিজস্ব বিপণন শাখার সাহায্যে। 

বাংলাদেশে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমগুলিকে সীমানা অনির্ধারিত এবং সীমানা নির্ধারিত এই দুই শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। প্রথমোক্ত শ্রেণিতে পড়ে পত্র-পত্রিকা, সাময়িকী, বেতার ও টেলিভিশনের মাধ্যমে দেয়া বিজ্ঞাপন এবং দ্বিতীয় শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে সেইসব বিজ্ঞাপন যেগুলি কোম্পানি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিজস্ব ব্যবস্থাপনা বা বিপণন শাখার মাধ্যমে বিলবোর্ডে ছবি বা লেখা এবং আলোকসজ্জিত প্রচারমূলক শব্দমালা বা প্রতিচ্ছবি, যাত্রা ও পথনাটক ইত্যাদি কিংবা গাড়ির বডিতে বা বেলুনের গায়ে আঁকা ছবি ইত্যাদি দ্বারা প্রচারের ব্যবস্থা করে। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশে বিজ্ঞাপন ব্যবসায়ের মোট পরিমাণ ছিল প্রায় ২০০ কোটি টাকা। বিজ্ঞাপন খরচের হার কত হবে তা নির্ভর করে বিজ্ঞাপন মাধ্যমের ধরন এবং তাতে ব্যবহূত জায়গা বা সময়ের পরিমাণের ওপর। পিক সময়ে (সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত) বাংলাদেশ টেলিভিশনে ৩০ সেকেন্ডের একটি বিজ্ঞাপন প্রচারের চার্জ হচ্ছে ৯,৪৫০ টাকা। তবে এই সময়ের মধ্যে শুধু একটি নির্ধারিত সময়েই প্রচার করাতে চাইলে ৫০% বেশি চার্জ দিতে হয়। সংবাদ প্রচারের ঠিক আগে বা অব্যবহিত পরে প্রচারের ক্ষেত্রে চার্জের পরিমাণ ৭০% বাড়ে এবং তা ১০০% হয় যদি বিজ্ঞাপন প্রদর্শিত হয় সংবাদ বা ছায়াছবি প্রচারের মাঝখানের বিরতিতে। সন্ধ্যা ৭টার আগে বিজ্ঞাপন প্রচারের চার্জ নিয়মিত চার্জের প্রায় অর্ধেক। 

কোন প্রতিষ্ঠান টেলিভিশনের কোন অনুষ্ঠান প্রযোজনার মাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচারের সুযোগ পেতে পারে। সেক্ষেত্রে সন্ধ্যা ৭টার আগে প্রচারের একটি অনুষ্ঠানে সর্বমোট ১৮০ সেকেন্ড বিজ্ঞাপন প্রচারের অধিকার পেতে এমন অনুষ্ঠানের ৬০ মিনিটের একটি এপিসোড প্রযোজনায় ফি দিতে হয় আশি হাজার টাকা আর একই রকম শর্তে পিক সময়ে প্রচারের জন্য ফি দিতে হয় এক লক্ষ টাকা। বাংলাদেশ টেলিভিশন বই এবং বিজ্ঞাপনবিহীন সাময়িকীর বিজ্ঞাপন প্রচারের ক্ষেত্রে নির্ধারিত চার্জের ওপর ২৫% ছাড় দেয়। তবে এই ছাড়-সুবিধা ভর্তি বা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের জন্য ছাপা গাইড বই-এর জন্য প্রযোজ্য নয়। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানও এই ছাড়-সুবিধা পায় না। দেশের বাইরে প্রস্ত্ত পণ্যসামগ্রীর বিজ্ঞাপন প্রচারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ টেলিভিশন নিয়মিত হারের ওপর ৬০% অতিরিক্ত চার্জ আদায় করে। 

বাংলাদেশ বেতারের বিজ্ঞাপন হার টেলিভিশনের তুলনায় অনেক কম। বেতারে ১৫ সেকেন্ডের একটি বিজ্ঞাপন ১ থেকে ৫১ বার পর্যন্ত প্রচারের ক্ষেত্রে চার্জ হচ্ছে প্রতিবার প্রচারের জন্য ৬০০ টাকা। বাংলাদেশ বেতার একটি ক্রিকেট ম্যাচ প্রচারের স্বত্ব বিক্রয় করে ৪৫,০০০ টাকায় এবং ফুটবল ম্যাচের জন্য নেয় ৩,০০০ টাকা। 

দেশে প্রচারিত পত্রিকাসমূহ বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য যে চার্জ নেয় তার হার ভিতরের পৃষ্ঠাসমূহের জন্য কলাম ইঞ্চিপ্রতি ৪০০ থেকে ৮০০ টাকা এবং প্রথম ও শেষ পৃষ্ঠার জন্য এর থেকে প্রায় তিন গুণ। বাংলাদেশে অদ্যাবধি বিজ্ঞাপন শিল্পের যে প্রবৃদ্ধি ঘটেছে তার সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির একটি সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমানে প্রায় সকল ধরনের বিজ্ঞাপন প্রতিষ্ঠানই প্রচুর প্রতিযোগিতার সম্মুখীন। বিজ্ঞাপন প্রতিষ্ঠানগুলি যাদের কার্যাদেশ নিয়ে ব্যবসা চালায় সেগুলির মধ্যে আছে বেসরকারি খাতের দেশীয় কোম্পানি, বহুজাতিক কোম্পানি এবং বিভিন্ন এনজিও। তবে বিজ্ঞাপন ব্যবসার ৬০% ভাগই আসে বহুজাতিক কোম্পানি থেকে আর ২৫% ভাগের উৎস হচ্ছে দেশীয় বেসরকারি কোম্পানি। 

বাজারে যেসব পণ্য যতবেশি প্রতিযোগিতার সম্মুখীন, সেগুলির জন্য বিজ্ঞাপনও ততবেশি প্রয়োজন। আর বিজ্ঞাপন বাজেটের বেশির ভাগই যায় ভোগ্যপণ্যাদির প্রচারে। সাধারণত স্থানীয় বাজারে যেসব খাতের পণ্য ও সেবার চাহিদা বেশি সেগুলিই বিজ্ঞাপনে বেশি ব্যয় করে থাকে। রপ্তানিমুখী শিল্পসমূহও বিজ্ঞাপনে অভ্যস্ত হতে শুরু করেছে এবং তাদের এ কাজের সূচনা হয়েছে মূলত প্রচারমূলক পুস্তিকার মাধ্যমে। সরকার বিজ্ঞাপন ব্যবসায়ের আইনগত দিক নিয়ন্ত্রণের জন্য সকল ধরনের বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনদাতা ও বিজ্ঞাপন প্রচার সংস্থার মধ্যে চুক্তি সম্পাদনের বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে। এই চুক্তির সাধারণ শর্তাবলি মুদ্রণ, প্রকাশনা  ও গণযোগাযোগ সংক্রান্ত আইন-কানুনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। তথ্য মন্ত্রণালয়ই মূলত প্রধান নিয়ন্ত্রক এবং কোন নির্দিষ্ট মাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচারের ক্ষেত্রে শর্তাবলিতে পরিবর্তন আনতে হলে এই মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রয়োজন। 

আবার ওষুধপত্র বা ধূমপান সামগ্রীর বিজ্ঞাপনের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি লাগে। এছাড়া সরকার বিজ্ঞাপনী সংস্থাসমূহ এবং প্রচার মাধ্যমের জন্য একটি সদাচরণ নীতিমালা প্রণয়ন করেছে, যা আইনের মর্যাদা না পেলেও সাধারণভাবে মেনে চলা বাঞ্ছনীয়। এই নীতিমালায় মদ, সিগারেট, শিশুদের জন্য শিল্পজাত খাদ্য, মহিলা ও পুরুষদের অন্তর্বাস এবং বড়ি ব্যতীত অন্যান্য জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর বিজ্ঞাপন প্রচার থেকে বিরত থাকতে বলা হয়। একই সঙ্গে তা প্রচার মাধ্যমসমূহকে সামাজিক নিয়মাচার ও নৈতিক মূল্যবোধ রক্ষা করে চলতে বলে, ধর্ম, ব্যক্তি বা সংস্থার প্রতি প্রত্যক্ষ আক্রমণ থেকে বিরত থাকতে বলে, রুচিবিবর্জিত সকল বিষয় পরিহার করতে বলে এবং কোন ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যাতে বিজ্ঞাপনে ব্যবহূত না হয় সেদিকে সতর্ক থাকতে বলে।  -সৈয়দ ফরহাত আনোয়ার

বিজ্ঞাপনের ভাষা : পণ্যের সঙ্গে ভোক্তার প্রথম সংযোগটি ঘটে বিজ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে

ভাষার ভূমিকা এতে প্রবল। শোনা ও দেখা- উভয়তই

বিজ্ঞাপনের মধ্যে বয়ে চলছে সময়। নানা মাধ্যমে। তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় উৎকর্ষের ফলে মানুষের সংস্কৃতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতি, রাজনীতি, শিল্পসাহিত্য, গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম- সবকিছুই যেন চলে গেছে বিজ্ঞাপনের দখলে। চোখ মেললেই দেখা যায় চারদিকে মানুষের অবিরাম ব্যস্ততা, আধুনিক বিজ্ঞান-প্রযুক্তির প্রভাব আর বিচিত্র বিজ্ঞাপন। চোখ বন্ধ করলেও কানে ভেসে আসে বিজ্ঞাপন। ঘর থেকে বাইরে পা বাড়ালেই শুরু হয় বিজ্ঞাপনের সঙ্গে চলা। রাস্তায়, বাড়ির ছাদে, মোড়ে মোড়ে দেখা মেলে বিলবোর্ডের। দেয়ালে বিজ্ঞাপন না লেখার জন্যও দিতে হয় বিজ্ঞাপন। চাকরির বিজ্ঞাপন, বাড়িভাড়ার বিজ্ঞাপন, পড়াতে চাই, পাত্রী চাই, গাড়ি-ফ্ল্যাট-জমি বিক্রি; মোবাইল মেসেজে বিজ্ঞাপন, অনলাইনে, অফলাইনে বিজ্ঞাপন- এসব আমাদের নিত্য ঘিরে রাখে। শূন্য আকাশেও ঠাঁই করে নিয়েছে বেলুন বিজ্ঞাপন। রঙবেরঙের সাইনবোর্ড, ব্যানার, পোস্টার, লিফলেট, ফ্লায়ার, ব্রুশিয়ার, নিয়ন সাইন, এলইডি ডিসপ্লে- সবই জানান দিচ্ছে এর উপস্থিতি। সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন, ইন্টারনেট, ইউটিউব, ফেসবুক, টুইটার- সর্বত্রই দেখা যায় বিজ্ঞাপনের দাপট। এটি নিয়ন্ত্রণ করছে মানুষের আবেগ, ভাবাবেগ। মানুষের রুচি ও সাজসজ্জা, পোশাক-পরিচ্ছদ, চলাফেরা, জীবনধারার সবকিছুই চলে গেছে বিজ্ঞাপনসংস্কৃতির দখলে; এমনকি মানুষ কথা বলছে বিজ্ঞাপনের ভাষায়। এর শৈলী বিচিত্র। ভাষার জাদুতেই যোগাযোগের প্রাণ পায় বিজ্ঞাপন।

বিজ্ঞাপনের ভাষা নির্ধারিত হয় মূলত পণ্যের ধরন ও ক্রেতাসাধারণের জীবনমানের ওপর ভিত্তি করে। এটি মূলত পরিকল্পিত যোগাযোগ। বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে পণ্য-সম্পর্কিত তথ্য জনসাধারণকে অবহিত করা হয়। এই যোগাযোগ প্রক্রিয়ার কল্যাণে পণ্য ও ভোক্তার মাঝে পারস্পরিক অদৃশ্য একটি সেতু তৈরি হয়। বিজ্ঞাপনের সাহায্যে সাধারণ মানুষের মনে পণ্যের প্রতি আগ্রহ জাগিয়ে তোলা হয়। আগ্রহী ব্যক্তি ক্রেতায় রূপান্তরিত হন। বিজ্ঞাপিত পণ্য কেনার জন্য তিনি সিদ্ধান্ত নেন। ক্রেতা বা ভোক্তার শ্রেণি নির্ণীত হয় তার আয়, জীবনধারা ও বসবাসের অঞ্চল বিবেচনায়। ভোক্তার জীবনমান, চাহিদা, আকাঙ্ক্ষা- এসবের ওপর ভিত্তি করে বিজ্ঞাপনের কাহিনি বা প্রেক্ষাপট তৈরি করা হয়ে থাকে। সে জন্য আইডিয়া তৈরি, শিরোনাম, বর্ণনা, সংলাপ, পে-অফ লাইন প্রভৃতি রচনার সমন্বিত কাজকে বলা হয় ‘কপিরাইটিং’। যিনি এই সৃষ্টিশীল কাজটি করেন তাকে বলা হয় ‘কপিরাইটার’। বিজ্ঞাপন এজেন্সির ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টরের তত্ত্বাবধানে কাজ করেন বেশ কয়েকজন কপিরাইটার। নির্মাণের প্রস্তুতি পর্বে একজন কপিরাইটার বেশ কয়েকটি আইডিয়া তৈরি করেন। প্রাক্-পর্যায়ের আইডিয়াগুলো থেকে প্রাথমিক বাছাইয়ের পর কাজ শুরু হয়। কাহিনি, ভাষা, চরিত্র, বর্ণনা, জিঙ্গেল ও পণ্যতথ্য প্রভৃতির সমন্বয়ে রচিত হয় পূর্ণাঙ্গ একটি কপি। কপি লেখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে শক্ত জায়গাটা হলো ‘সময়ের গন্ডি। একজন কপিরাইটারের প্রধান চ্যালেঞ্জই হলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিজ্ঞাপনটি সম্পন্ন করা। সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন অর্থাৎ যেকোনো গণমাধ্যমে একটি বিজ্ঞাপন প্রকাশ বা প্রচারের ক্ষেত্রে প্রতিবার নির্দিষ্ট পরিমাণ অঙ্কের অর্থ গুনতে হয়। অর্থের বিনিময়ে প্রচারের কারণে এর সময়ের পরিসর খুবই সংক্ষিপ্ত হয়ে থাকে। তাই বিজ্ঞাপন কপিলিখন কৌশলে সময় সংক্ষিপ্ততার বাধ্যবাধকতাগুলো সচেতনভাবেই অনুসরণ করা হয়ে থাকে। এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যেই একজন কপিরাইটার বিজ্ঞাপনের কাহিনিচিত্রে তুলে আনেন বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ, জীবনসংগ্রাম, প্রেম-প্রকৃতি, সমাজ-সংস্কৃতি, মানবতা, দেশপ্রেম ও বিশ্বলোক। পণ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টির জন্য বিজ্ঞাপনে ভাষার সাহায্যে তৈরি করা হয় ‘জাদুফাঁদ’। এর আবহ তৈরি হয় কথা, কাব্যময় বর্ণনা ও সংগীতের মিশেলে। বিজ্ঞাপনের ভাষা নির্ধারণে প্রধান ভূমিকা পালন করে পণ্যের ধরন, ক্রেতাশ্রেণির জীবনসংস্কৃতি ও প্রচারমাধ্যমের বৈশিষ্ট্য।

ভাষা সব সময় সমকালীন জীবনসংস্কৃতির অংশ। সমাজ সম্পর্কে এটি বিশ্বাসযোগ্য ধারণাও দেয়। বিজ্ঞাপনের ভাষাও সমকালীন জীবনের বাইরে নয়। একটি বিজ্ঞাপনের বিষয় ও ভাষা নির্বাচনে প্রধানত গুরুত্ব দেওয়া হয় পণ্য বা সেবার ধরন, ক্রেতার শ্রেণি ও প্রচারমাধ্যমের ওপর। গণমাধ্যমভেদে বিজ্ঞাপনের রকমফের রয়েছে। মুদ্রণমাধ্যমের বিজ্ঞাপনকে বলা হয় ‘প্রেসঅ্যাড’, রেডিও বিজ্ঞাপন হলো ‘আরডিসি’ অর্থাৎ রেডিও কমার্শিয়াল, টেলিভিশন বিজ্ঞাপনকে বলা হয় ‘টিভিসি’ অর্থাৎ টেলিভিশন কমার্শিয়াল, ইন্টারনেটের বিজ্ঞাপন হলো ‘ইঅ্যাড’ বা ‘ওয়েবঅ্যাড’। পণ্য ও প্রচারমাধ্যমভেদে ক্রেতার শ্রেণি আলাদা হয়ে যায়। সংবাদপত্রের পাঠক, বেতার শ্রোতা ও টিভি দর্শকশ্রেণির অবস্থান ও জীবনমান ভিন্নতর। বিজ্ঞাপনের এই মাধ্যমবৈচিত্র্যের কারণে নিশ্চিতভাবেই পাঠক, শ্রোতা ও দর্শক ভিন্ন ভিন্ন বয়স, লিঙ্গ ও মর্জির হয়ে থাকে। সংবাদপত্র, বিলবোর্ড, রেডিও, টেলিভিশন ও ইন্টারনেট- এসব গণমাধ্যমের প্রযুক্তিগত ভিন্নতার ফলে বিজ্ঞাপনের কপিলিখনের আঙ্গিক বৈশিষ্ট্য আলাদা হয়ে থাকে। যেমন কাপড় কাচা বল সাবানের বিজ্ঞাপন। তৈরির জন্য প্রথমেই ভাবনায় আনতে হবে পণ্যটির ধরন, বিক্রয়মূল্য ও কোন শ্রেণির ভোক্তাসাধারণ পণ্যটি ব্যবহার করবে- এই কটি বিষয়। ধরে নেওয়া যাক গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষ এই পণ্যের প্রধান টার্গেট। অন্যদিকে স্মার্টফোনের বিক্রয় টার্গেট ‘কাপড় কাচা বল সাবান’ থেকে আপনাতেই ভিন্ন হয়ে যাবে। এর মূল কারণ পণ্যের ধরন, মূল্যমান ও ব্যবহারকারীর শ্রেণিপার্থক্য। দুটি পণ্যের ধরনবৈশিষ্ট্য, মূল্যমান ও ভোক্তাশ্রেণি সবই ভিন্ন। বিজ্ঞাপনচিত্রের কাহিনি, চরিত্র, ভাষা ও নির্মাণশৈলী সম্পূর্ণ আলাদা হবে। এ ক্ষেত্রে টার্গেট জনগোষ্ঠীর জীবনধারা ও ভাষাসংস্কৃতিকে অধিকতর গুরুত্ব দিতে হবে। ‘কপি’ পণ্যের উপযোগী না হলে কোনোভাবেই একটি ভালো বিজ্ঞাপন নির্মাণ করা সম্ভব নয়। ক্রেতাকে বিজ্ঞাপনের সঙ্গে সংযুক্ত করতে সাহায্য করে এই কপি। পণ্যসম্পর্কিত তথ্য দেওয়া বিজ্ঞাপনের প্রাথমিক ও প্রধান শর্ত। তা এমনভাবে বাস্তবায়ন করতে হয়, যাতে ভোক্তাদের মধ্যে পণ্যটি বিশেষ সাড়া তৈরি করে। মুগ্ধতা সৃষ্টির মধ্য দিয়ে অভীষ্ট ক্রেতাকে মোহাচ্ছন্ন করে। টার্গেট ক্রেতাশ্রেণির রুচি বিবেচনায় এনে তাদের যাপিত জীবনের গল্পকথা ও নিত্যদিনের ব্যবহৃত ভাষা একজন কপিরাইটার তাঁর কপিলিখনে ব্যবহার করেন। বিজ্ঞাপনের ভাষায় তাই বৈচিত্র্য পরিলক্ষিত হয়। মুগ্ধ দর্শকশ্রোতা পণ্য ক্রয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। বিজ্ঞাপনের ভাষার শৈল্পিক ব্যবহার মন কাড়ে সব বয়সী মানুষের। বারবার প্রচারের কল্যাণে বিজ্ঞাপন অল্প সময়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মানুষের মনের আয়নায় গেঁথে যায়, ফেরে মুখে মুখে। আধুনিক সমাজের ভাষারুচি নির্মাণে বিজ্ঞাপনের ভাষা অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করছে।

সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে বিপণনকৌশল। আধুনিক বিপণনকৌশলের প্রধান একটি হাতিয়ার হলো বিজ্ঞাপন। মাধ্যমভেদে বিজ্ঞাপন নানান ধরনের হয়ে থাকে; তবে লক্ষ্য অভিন্ন- ক্রেতাকে আকৃষ্ট করা এবং উৎপাদিত পণ্যের বিক্রি বাড়ানো। পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সাধারণত বিজ্ঞাপন নির্মাণ করে না। বিজ্ঞাপনদাতা বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলো পেশাদার বিজ্ঞাপন নির্মাতা এজেন্সিকে এই কাজে নিয়োজিত করে। পণ্যের বিজ্ঞাপন পরিকল্পনা, নির্মাণ ও প্রচারের দায়িত্ব নির্দিষ্ট কোনো বিজ্ঞাপনী সংস্থা বা এজেন্সিকে দেওয়া হয়। সৃজনশীল ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত বিজ্ঞাপনসংক্রান্ত শিল্পকর্মের একটি স্বতন্ত্র ব্যবসা পরিকল্পনা করে এজেন্সিগুলো। ব্র্যান্ডিং পরিকল্পনা থেকে শুরু করে প্রচার পর্যন্ত সব ধরনের কাজ এই প্রতিষ্ঠানগুলো করে থাকে। এ ব্যাপারে পরামর্শও দিয়ে থাকে। বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠান বা ক্লায়েন্ট প্রথমে তাদের পণ্য বা ব্র্যান্ড সম্পর্কে তথ্য-উপাত্ত ও চাহিদার ধারণা বিজ্ঞাপন এজেন্সিকে দেয়। সে অনুযায়ী গবেষণা ও পরিকল্পনা চলে। পণ্য ও কোম্পানির নাম, ধরন, মূল্য এবং পণ্যটির ক্রেতা-ভোক্তার শ্রেণিচরিত্র মাঠপর্যায়ের গবেষণায় পাওয়া তথ্য-উপাত্ত বিচার-বিশ্লেষণের আলোকে বিজ্ঞাপনের ডিজাইন উপস্থাপন করে। তা আলোচনা-পর্যালোচনা, মতামত ও পরামর্শের মাধ্যমে বিজ্ঞাপনের আঙ্গিক ও কপি চূড়ান্ত করা হয়। ক্লায়েন্টের পরামর্শ অনুযায়ী সংযোজন-বিয়োজন করে বিজ্ঞাপন নির্মাণের জন্য এজেন্সি একটি বাজেট তৈরি করে। তা অনুমোদন করার পর বিজ্ঞাপন এজেন্সি প্রডাকশন হাউজকে বিজ্ঞাপনটি নির্মাণের জন্য ওয়ার্ক অর্ডার দেয়। বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠান, বিজ্ঞাপন এজেন্সি ও প্রডাকশন হাউজ- এই ত্রিপক্ষীয় মতামতের ভিত্তিতে একটি বিজ্ঞাপনের কাঠামো, বিষয়, ভাষা, কলাকুশলী ও বাজেট চূড়ান্তভাবে অনুমোদন দেওয়া হয়। এই কর্মযজ্ঞ সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। নেপথ্যে থাকেন একদল সৃষ্টিশীল মানুষ। অনেকেই মনে করেন বিজ্ঞাপন একটি ‘মিশ্রমাধ্যমের ফরমায়েশি শিল্পকর্ম’। অর্থাৎ একটি পণ্যের প্রচার ও বিক্রির প্রসারের প্রয়োজনে আদিষ্ট হয়ে অর্থের বিনিময়ে সৃজিত একটি শিল্পকর্ম। এ কারণে বিজ্ঞাপনের কাঠামো, বিষয়, ভাষা ও কলাকুশলী নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্তাব্যক্তিদের চিন্তা, মতামত বা পরামর্শকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হয়। কপিরাইটারের লিখিত চিন্তা, ভাবনা, গল্প বা জিঙ্গেলকে নান্দনিকভাবে দৃশ্যায়ন করে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। বিজ্ঞাপনের ভাষালিখন ও নির্ধারণে কপিরাইটারই প্রধান ভূমিকা পালন করে থাকেন। তবে শীর্ষ কর্তাব্যক্তিদের অভিমত ও বিজ্ঞাপন নির্মাতা নির্দেশকের ভূমিকা এতে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশেই এখন নির্মিত হচ্ছে বিশ্বমানের বিজ্ঞাপন। প্রাচীন গুহাচিত্র, দেয়ালগাত্র, মৌখিক ঘোষণা, মুদ্রণমাধ্যম, বেতার, টেলিভিশন প্রভৃতির হাত ধরে আজকের বিজ্ঞাপন আধুনিক গ্রাফিক ও ক্যামেরাবন্দি হয়ে প্রবেশ করেছে ইন্টারনেট দুনিয়ায়। প্রতিযোগিতার টিকে থাকার জন্য বিজ্ঞাপনে ব্যবহৃত হচ্ছে উন্নত প্রযুক্তি ও সমসাময়িক কাহিনি, বিষয় ও ভাষা।

আধুনিক জীবনের সঙ্গে বিজ্ঞাপন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বর্তমানে পণ্যের প্রচার ও প্রসারের ক্ষেত্রে এর বিকল্প নেই। গণমাধ্যমে বারবার প্রচারের সূত্রে এর ভাষাগত দিকটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। বিজ্ঞাপনেরও রয়েছে নৈতিকতা এবং আর্থসামাজিক দায়বদ্ধতা। ফলে এর ভাষা ও উপস্থাপনায় দেশের প্রচলিত আইন, রীতি-নীতি, আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বিভিন্ন দিক বিবেচনায় রাখতে হয়। বিজ্ঞাপন যেহেতু কোনো একটি পণ্য বা সেবা সম্পর্কে প্রচার, সেহেতু এর সঙ্গে নীতিনৈতিকতার প্রশ্নটিও গভীরভাবে জড়িত। কেবল ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে সম্পর্কই এটি স্থাপন করে না, মানুষের মধ্যে সচেতনতা ও সমাজসংস্কারমূলক চিন্তার বিস্তারও ঘটায়, ইতিবাচক ভাবনাগুলোকে উসকে দেয়, পরিবর্তন আনতে সাহায্য করে সনাতন চিন্তা-চেতনার। এর একটি জাদুকরি শক্তি রয়েছে যা সমাজকে প্রভাবিত করে। তাতে সমকালীন ভাবনার বিকাশ ঘটে। ভাষা প্রয়োগের চমৎকারিত্বেই এমনটি ঘটে’। বিজ্ঞাপনের ভাষা যত সরল ও আকর্ষণীয় হবে, মানুষ তত মনে রাখতে পারবে। তবে সময়ের চাহিদা অনুযায়ী বিজ্ঞাপনের ভাষার বদল ঘটে। সময় বদল হলেও মানুষ মনে রেখেছে কিছু বিজ্ঞাপনকে, যেগুলোর ভাষা চিরন্তন, সহজ ও মার্জিত। যেমন ‘মাছের রাজা ইলিশ বাত্তির রাজা ফিলিপস’, ‘ইকোনো লেখে চমৎকার এক কলমে মাইল পার’, ‘কাছে থাকুন’, ‘চুলের যত্নে আর একচুলও ছাড় নয়’, ‘যেখানে দিনবদলের চেষ্টা সেখানেই বাংলালিংক’, ‘নতুন কিছু করো’, ‘সৌন্দর্য গায়ের রঙে নয়- ফ্রেশ মানেই সুন্দর’, ‘চলো বহুদূর’, ‘সিলন চা- কাপ শেষ তবু রেশ রয়ে যায়’, ‘জ্বলে উঠুন আপন শক্তিতে’, ‘আমাদের আগামী বেড়ে উঠুক আলোয় আলোয়’। বিজ্ঞাপনে ব্যবহৃত এ ধরনের ভাষা মানুষকে উদ্দীপ্ত করে, সচেতন করে, প্রেরণা দেয়। সমাজের অন্ধ কুসংস্কার ও কূপমন্ডূকতা দূর করতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। হাল আমলের বিপণনকৌশলে বিজ্ঞাপনকে এখন শুধু পণ্য বিক্রির উপায় হিসেবে দেখা হচ্ছে না।
সামাজিক মূল্যবোধ বা নৈতিকতার প্রতিকূল বিজ্ঞাপনও বাংলাদেশের গণমাধ্যমে নিয়মিত প্রচারিত হচ্ছে। ব্যবহৃত সংলাপ, ভাষা বা আচরণ প্রভাব ফেলছে জনজীবনে। অনুকরণ মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। বিজ্ঞাপনে ব্যবহৃত সংলাপ বা পে-অফ লাইন মানুষ অনুকরণ করে, এসবের প্রতিফলনও যায় দৈনন্দিন জীবনে। বিজ্ঞাপনে ব্যবহৃত নেতিবাচক বিষয়, সংলাপ বা জিঙ্গেল সাধারণ মানুষ বিভিন্ন আড্ডা, বিতর্ক বা আলোচনা-সমালোচনায় নানা বিষয়-ঘটনার সঙ্গে মিলিয়ে প্রয়োগ করে। বহুল প্রচারিত বিজ্ঞাপনের নেতিবাচক ভাষা খুব সহজেই মানুষ মনে রাখে। এসব কদর্য ভাষা দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার করার কারণে মানুষের মধ্যে নানা ধরনের অশুভ চিন্তা প্রবেশ করে, কৃত্রিম চাহিদা বৃদ্ধি পায়, হতাশায় নিমজ্জিত হয় যুবসমাজ। ক্রমশই হ্রাস পাচ্ছে মান ভাষার কদর, সামাজিক ও মূল্যবোধ। চলতি সময়ে নান্দনিক বিজ্ঞাপন নির্মাণের পাশাপাশি কিছু অপবিজ্ঞাপনও নির্মিত হচ্ছে। অল্প সময়ে পণ্যের দ্রুত প্রচার-প্রসার লাভের প্রত্যাশায় ভাষার বিকৃতি, ভুল ও গোলমেলে ব্যবহার, আঞ্চলিক ভাষার অপপ্রয়োগ, অরুচিকর শব্দ ও কদর্য বাক্য অবলীলায় ব্যবহৃত হচ্ছে। বিজ্ঞাপনে ভাষা বিকৃতির ফলে শিশু-কিশোর ও তরুণসমাজে অশোভন ভাষাচর্চা স্বাভাবিকতায় রূপ নিচ্ছে। এখনকার প্রচারিত বিজ্ঞাপনে ভাষার অপপ্রয়োগের কতিপয় নমুনা: ‘এটম খাও চাপার জোর বাড়াও!’; ‘আর কত কুপাইবেন? এবার থামেন, একটু জিরান, জিরাপানি খান’; ‘আউট দে নইলে কাঁচাই খাইয়া ফালামু’; ‘ব্যাম্বো ইজ অন, এরপর আর কেউ বাঁচাইতে পারবো না- ডাইরেক ভাইঙ্গ্যা দিমু’। এভাবেই চারদিকে চলছে ভাষাদূষণের নানা আয়োজন। বাংলা ভাষা আজ বিপর্যস্ত। নতুন প্রজন্মের একটি অংশ বাংলা ভাষার বিকৃত উচ্চারণ করে চলেছে, কেউ কেউ আবার এটাকে বাহবাও দেয়। ইংরেজি ও বাংলার মিশেলে বাংলাকে আর চেনা যায় না। অথচ অনেক ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে বাংলা ভাষায় আমাদের বলা ও লেখার অধিকার।

লেখক: ড. ইসলাম শফিক, শিক্ষক ও গণমাধ্যম গবেষক
mishafique@gmail.com

বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রিত জীবন: কেন হয় এমন?

চাকরি হচ্ছে না? আজই ব্যবহার করুন ‘এফ এন্ড এফ সাদা ক্রিম’, চাকরি সুনিশ্চিত!
আপনার সোনামণি কি পরীক্ষায় লিখে শেষ করতে পারছে না? আজই তাকে খেতে দিন ‘হারকিউলিস ড্রিঙ্কস’ আর তাকে করে তুলুন এক্সাম রেডি!

আধুনিক জীবন এরকমই নানা বিজ্ঞাপনের বিস্তৃত জালের মাঝে আটকে শুধু হাত-পা ছোঁড়াছুড়ি চলেছে প্রতিটি মুহূর্ত। বিজ্ঞাপন তো নয়, যেন অনুভূতি নিয়ে খেলা! টেলিভিশন চালু করলে বিজ্ঞাপন, রেডিও চালু করলে বিজ্ঞাপন, রাস্তা দিয়ে হাঁটতে গেলে পাশের দেয়ালে বিজ্ঞাপন, একটু উপরে তাকালে হাজারো বিলবোর্ডের বিজ্ঞাপন, ল্যাম্পপোস্টের গায়ে বিজ্ঞাপন- এমনই নানা বিজ্ঞাপনের চাপে পিষ্ট সকলে। আজকাল তো টেলিভিশনে নাটক বা অন্য কোনো অনুষ্ঠান দেখতে বসে ভুলেই যেতে হয় অনুষ্ঠানের মাঝে বিজ্ঞাপন নাকি বিজ্ঞাপনের মাঝে অনুষ্ঠান! সর্বদাই চলছে এই বিজ্ঞাপন যন্ত্রণা। সাধারণ মানুষজন তা বুঝেও যেন না বোঝার ভান করে চলেছি। এটি আপনার দোষ নয়, দোষ নয় বিজ্ঞাপনদাতাদেরও। এটি আমাদের উপর এমনভাবেই প্রভাব ফেলে যে আমরা একটি সময় গিয়ে সাড়া দিয়ে ফেলবো। কিন্তু কীভাবে এই বিজ্ঞাপনগুলো প্রভাবিত করছে আমাদের?

বিজ্ঞাপন, আধুনিক জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ; 

বিজ্ঞাপনের মাধ্যম

এই যে আধুনিকায়নের যুগ, এটি তৈরি করেছে মানুষই। তবে কারো একার পক্ষে সবকিছু সরবরাহ করা তো সম্ভব নয়, তাই শরণাপন্ন হয়েছে একে অন্যের কাছে। প্রথম দিকে চেনা-পরিচিতদের মধ্যে প্রয়োজনীয় জিনিসপাতি আদান-প্রদান চলত। কিন্তু ধীরে ধীরে মানুষের চাহিদা এতটাই বাড়তে থাকলো যে, শুধু নিজেদের মধ্যের কয়েকটি জিনিস দিয়ে স্বচ্ছন্দ্যে জীবন চলছে না। তখন আবার কেউ কেউ নতুন নতুন জিনিসপত্র উদ্ভাবনও করছিল। তা সবার কাছে পৌঁছে দেবার জন্য ফেরি করা শুরু করলো। দেখল, তাতেও হচ্ছে না। তারপর কোথাও কোথাও দেয়াল লিখনের মাধ্যমে নিজের তৈরি পণ্য সম্পর্কে জানানোর প্রবণতা দেখা গিয়েছিল।

দেয়ালে বিজ্ঞাপনের বাহার; 

পত্রিকা এবং ম্যাগাজিন আবিষ্কারের পর ধীরে ধীরে সকলে উপলব্ধি করে, এটিই হতে পারে প্রচারের বড় একটি মাধ্যম। এর পরের ঘটনা সকলেরই জানা। রেডিও, টেলিভিশনের অন্যতম অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই বিজ্ঞাপন। রঙিন, সুরেলা বিভিন্ন বিজ্ঞাপনও রয়েছে, যেগুলো দৃষ্টি আকর্ষণ করে সবচেয়ে বেশি। সেই প্রাচীনকালের নিয়মে দেয়াল লিখনে বিজ্ঞাপনেরও দেখা মিলবে সবখানেই। তাছাড়া আধুনিক বিলবোর্ড তো আছেই। আজকাল আবার বিভিন্ন দালানে রঙ-বেরঙের নকশা বা পেইন্টিং ব্যবহারের পরিবর্তে বিজ্ঞাপন আঁকাও দেখা যাচ্ছে। এছাড়াও ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রেও রয়েছে বিজ্ঞাপন বিড়ম্বনা।

বিলবোর্ড; 

বিজ্ঞাপন এবং আমাদের ভাবনা

বিজ্ঞাপন দেখে ভাবনা একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম। যেমন ধরুন একটি চকলেটের বিজ্ঞাপন দেখে আপনি আকৃষ্ট না হলেও আপনার চার বছর বয়সী ছোট ভাইটি ঠিকই মনোযোগ সহকারে দেখছে। আবার একটি রঙ ফর্সাকারী ক্রিম দেখে আপনার বোনটি আকৃষ্ট হচ্ছে। অর্থাৎ নিজেদের আগ্রহের স্থান থেকেই আমরা বিজ্ঞাপনের দিকে খেয়াল করি। একটি ক্ষেত্রে প্রত্যেকের ভাবনায় মিল আছে- সকলেই ভাবে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে পণ্য সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানানো হচ্ছে, যাতে আমরা সঠিক পণ্য বাছাই করতে পারি। অজস্র ঠান্ডা পানীয়ের বিজ্ঞাপন দেখে শেষ পর্যন্ত আপনি হয়তো এমন একটি বেছে নিলেন, যেটির বিজ্ঞাপনে আপনার প্রয়োজনকে বেশি তুলে ধরা হয়েছে, বা বাঘের মতো শক্তি পেয়ে যাবেন এমন আশ্বাস দিয়েছে!

বিজ্ঞাপন আসলে কী করছে?

বিজ্ঞাপন আসলে আমাদের প্রভাবিত করছে। অনেকেই বলে থাকবেন যে তারা বিজ্ঞাপনের দ্বারা একেবারেই প্রভাবিত হন না। কিন্তু সত্য হলো এ-ই যে, আপনি আপনার অজান্তেই বিজ্ঞাপনের প্রভাবের শিকার। বিজ্ঞাপনের দুইটি ধরণ হতে পারে, যেগুলো যৌক্তিক বা অযৌক্তিক বা দুয়ের সংমিশ্রণে হতে পারে।
যেমন-

১। পণ্যকেন্দ্রিক বিজ্ঞাপন

যে পণ্য আপনি চেনেন না, কোনোদিন নামই শোনেন নি এমন পণ্য নিশ্চয়ই কিনতে চাইবেন না। তাই বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তথ্য প্রদান করা হয়। এ ধরনের বিজ্ঞাপনগুলো সাধারণত যৌক্তিক হয়ে থাকে। এতে পণ্যের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের একাংশ তুলে ধরার পাশাপাশি সেগুলোর ব্যবহার সম্পর্কেও তুলে ধরে। এই বিজ্ঞাপনগুলো ভোক্তাকেন্দ্রিক নয়, পণ্যকেন্দ্রিক। এ ধরনের বিজ্ঞাপনগুলো দেখে আপনি পণ্যটি কেন কিনবেন, তা সম্পর্কিত ধারণা পাবেন এবং একইরকম অন্য পণ্যটি কেন কিনবেন না- তা উল্লেখ করা হয়। উদাহরণ হতে পারে বিভিন্ন হেলথ ড্রিংক্সের বিজ্ঞাপন।

কোকাকোলার একটি বিজ্ঞাপন; ছোট, কিন্তু প্রভাবিত করার মতো; 
তবে এক্ষেত্রে শুধু কোম্পানির ভালো দিকগুলোই তুলে ধরা হয়, আসল তথ্যগুলো কিন্তু আড়ালেই রয়ে যায়। তবুও সাধারণ জনগণ কিন্তু সেগুলোকেই ফোকাস করে পণ্যটি কিনে ফেলেন।

২। ভোক্তাকেন্দ্রিক বিজ্ঞাপন

এগুলো অনেকটাই অযৌক্তিক। যেমন ধরুন, প্রসাধনী পণ্যের বিজ্ঞাপন চলছে। দেখাচ্ছে একটি মেয়ে কালো বলে তার চাকরি হচ্ছে না। তারপর মেয়েটি ঐ প্রসাধনী ব্যবহার শুরু করলো এবং তার বড় একটি চাকরি হয়ে গেল! এমন পণ্য দেখে প্রথমত আপনার হাসি পেতে পারে, বিরক্তি আসতে পারে। কিন্তু পরক্ষণেই আপনার মনে হতে পারে যদি সত্যি এমন হয়? চেষ্টা করলে ক্ষতি কী! আর এভাবেই বিজ্ঞাপন আপনাকে প্রভাবিত করে ফেলতে পারে।


ভারতের কিছু পত্রিকায় বিজ্ঞাপনের বাহার, বাংলাদেশের পত্রিকাগুলো সম্পর্কে তো সকলে অবহিত; 
মোট কথা, বিজ্ঞাপন আমাদের অনুভূতি নিয়ে খেলা করে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘অ্যাফেক্টিভ কন্ডিশনিং’ বা ‘আবেগীয় শর্তারোপ’ বলা হয়ে থাকে। অনুভূতি নিয়ে খেলাটা অনেকটা এমন যে আপনি আপনার পরিচিত পণ্যটির ব্যবহার থেকে বের হয়ে যেন বিজ্ঞাপন দেখে ঐ পণ্যটি কেনেন। এবং এটিই হয়। কোনো একটি পণ্য সম্পর্কে ভালো এবং ইতিবাচক অনুভূতি সৃষ্টি করে চলতি অন্যান্য পণ্যের থেকে মূল্যবান বা আকর্ষণীয় করে তোলে বিজ্ঞাপন। তাই দেখা যায় টিভি বা পত্রিকা বা ম্যাগাজিনের অসংখ্য বিজ্ঞাপন এড়িয়ে যেতে চেয়েও তা আমাদের প্রভাবিত করে ফেলে।

জেনে বুঝে কেন আমরা প্রভাবিত হই?

বিজ্ঞাপন দেখে প্ররোচিত হয়ে কতকিছুই না কেনা হয়, ব্যবহার করা হয় প্রতিদিন। কোনোটি উপকার করছে ,আবার কোনোটি ব্যবহার করে টাকা যেন জলে ফেলা হলো। কিন্তু কেন? তা কি শুধুই বিজ্ঞাপনের প্রভাব? অনেকটা তা-ই। ব্যস্ত জীবনযাত্রায় কোনোকিছুতেই যেন নির্ভরতা খুঁজে পাওয়া যায় না, সেটি পণ্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে হোক বা সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে। তাই সকলে সেটিই বেছে নেন, যা কিছুটা ভালো অনুভূতির সৃষ্টি করে বা মন্দ অনুভূতি থেকে মুক্তি দেবে। আর তাই বিজ্ঞাপন দ্বারা সহজেই প্রভাবিত হই।


টেলিভিশনে অনুষ্ঠান দেখতে বসে আজকাল ভুলেই যেতে হয় কী দেখছি, বিজ্ঞাপনের এতটাই প্রভাব; 
আরেকটি কারণ হলো অভিজ্ঞতা। ধরুন, পূর্বে কোনো একটি বিজ্ঞাপন দেখে একটি পণ্য কিনে ভালো ফলাফল পেয়েছেন। আর তাই পরবর্তীতে বিজ্ঞাপন দেখে আকর্ষণীয় লাগলেই মনে হয়, সেটি ভালোই হবে! বিজ্ঞাপনদাতারা এভাবেই আপনাদের মানসিক জগতে প্রবেশাধিকার পেয়ে যায়। সেই অধিকার তো আপনিই দিচ্ছেন- জানতে বা অজান্তে।

কিছুই কি করার নেই?

বিজ্ঞাপন আপনার অনুভুতি নিয়ে খেলে যাবে আর আপনার কিছুই করার থাকবে না? বিজ্ঞাপনগুলোর বেশিরভাগই মনোবিজ্ঞানের কার্যকর তত্ত্ব ব্যবহার করে করা হয়, তাই তা সহজেই আপনার অনুভূতির কাছাকাছি পৌঁছে যায়। কিন্তু অনুভূতি তো আপনার। তা আপনি যদি একটু সচেতন হতে পারেন, তাহলেই এই খেলায় ভুক্তভোগী হতে হয় না। বিজ্ঞাপন দেখে না গলে যাচাই করে পণ্য ব্যবহারের অভ্যাস করুন। আর আপনার বাসায় যে ছোট বাচ্চাটি রয়েছে, তাকেও বিজ্ঞাপনের বাস্তব দিক এবং কাল্পনিক দিকগুলোকে আলাদা করতে সাহায্য করুন, বুঝিয়ে বলুন। 
-Kaniz Fatema Koly//

ইতিহাস : বিজ্ঞাপনের বৈপ্লবিক পরিবর্তন: শুরুর কথা

টেলিভিশন ও ইন্টারনেট প্রযুক্তির আগে সীমিত সংখ্যক প্রিন্ট মিডিয়া বিজ্ঞাপন প্রচারের কাজটি করতো। তারও আগে, যখন প্রিন্ট মিডিয়ার অস্তিত্বও ছিল না, বিজ্ঞাপন প্রচার হতো নানান জায়গায়- বাজারে, জনতার ভিড়ে কবিতা আবৃত্তি করে, গান গেয়ে শোনানোর মাধ্যমে, দেয়ালে গ্রাফিতি এঁকে কিংবা পাথর, কাঠ, স্টিলের পাতে খোদাই করে। নির্দিষ্ট কিছু পণ্য, সেবা, ইভেন্টের প্রচার-প্রসার, এমনকি রাজনৈতিক ক্যাম্পেইন, আসামী ধরার কাজেও বিজ্ঞাপনের ব্যবহার হতো সীমিত পরিসরে।

যোগাযোগ ব্যবস্থার অগ্রগতি, ভোক্তা ও মিডিয়া বৃদ্ধির সাথে তাল মিলিয়ে বিজ্ঞাপন প্রচার-প্রসারেও বেশ বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে রেডিও ও টেলিভিশনের মতো ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার কল্যাণে বিজ্ঞাপনের ইতিহাসে যুক্ত হয় নতুন মাইলফলক। এরপর ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া এসে এই ধারাকে এত বেশি তরান্বিত করে যে, বর্তমানে উন্নত প্রযুক্তির কল্যাণে প্রতিষ্ঠানগুলো একেবারে ব্যক্তি পর্যায়ে তাদের পণ্য ও সেবার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে পারছে।

বিজ্ঞাপনের বৈপ্লবিক পরিবর্তনের টাইমলাইনের একাংশ; বর্তমানে রেডিও-টেলিভিশন কমার্শিয়াল, বিলবোর্ড, অনলাইন স্ট্রিমিংয়ের সময় হঠাৎ শুরু হওয়া ভিডিও, বিরক্তিকর পপ-আপ মেসেজে প্রত্যেকদিন প্রায় শত শত বিজ্ঞাপন আমাদের চোখে পড়ে। প্রাসঙ্গিক হোক বা অপ্রাসঙ্গিক; যতক্ষণ পর্যন্ত না আপনি বাইরে ঘুরতে যাওয়া, টেলিভিশন দেখা, রেডিও শোনা, ম্যাগাজিন বা পত্রিকা পড়া, গেমিং, কিংবা ইন্টারনেট ব্রাউজ করা বন্ধ করে দেবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত এগুলো এড়ানো প্রায় অসম্ভব। আপনি পছন্দ করুন বা না করুন, বিজ্ঞাপনগুলো অসংখ্যবার আপনার চোখে পড়বেই।

কিন্তু বিজ্ঞাপনের এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনের শুরুটা হয় কখন?

প্রিন্টিং প্রেস শুরুর আগে

বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে পণ্য ও সেবার প্রচার-প্রসারের ইতিহাস প্রায় কয়েক হাজার বছরের পুরনো। কোন প্রতিষ্ঠান কবে, কখন এর প্রচলন করেছিল তা জানা না গেলেও বিভিন্ন ধ্বংসাবশেষ থেকে পাওয়া নানা তথ্য-চিত্র সাপেক্ষে সেসময়ে বিজ্ঞাপন প্রচারের কাজে প্যাপিরাসের ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়।

প্রাচীন মিশরে প্যাপিরাসে বিক্রয়যোগ্য পণ্যের প্রচার হতো। হারিয়ে যাওয়া পম্পেই নগরীর ধ্বংসাবশেষ এবং প্রাচীন আরবের বিভিন্ন জায়গা থেকে প্যাপিরাসে লেখা বাণিজ্যিক বার্তা এবং রাজনৈতিক ক্যাম্পেইনের উদ্দেশ্যে তৈরি লিফলেট ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় দুই হাজার বছর আগে প্রাচীন গ্রিস, রোমে এসব কাজে লেখালেখির এই মাধ্যমটির বহু প্রচলন দেখা যায়।

তবে তারও আগে এশিয়া, আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকায় পাথরের দেয়ালে খোদাই করে কিংবা গ্রাফিতি এঁকেও বিজ্ঞাপন প্রচার হতো। এমনকি আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতেও খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় চার হাজার বছর আগের পাথরে খোদাই করা নোটিশ আবিষ্কৃত হয়েছে।

চাইনিজ শিজিং বা ক্লাসিক অফ পয়েন্ট্রিতে উল্লেখ রয়েছে, খ্রিষ্টপূর্ব এগারো থেকে সপ্তম শতাব্দীর চীনে ক্যান্ডি বা মিঠাই জাতীয় খাবার বিক্রির উদ্দেশ্যে বাঁশি বাজিয়ে ক্রেতাদের আহ্বান করা হতো। সে সময় ক্যালিগ্রাফিক বিলবোর্ডের প্রচলনের কথাও উল্লেখ রয়েছে।

পূর্ব চীনের জিনান শহর থেকে সং রাজবংশের সময়কার তৈরি তামার পাতে লেখা একটি বিজ্ঞাপন উদ্ধার করা হয়। বিজ্ঞাপনটির উপরের অংশে খরগোশের লোগো সহ ‘লিউসের সূক্ষ্ম সুঁইয়ের দোকান’ এবং নিচের অংশে ‘আমরা উচ্চমানের ইস্পাতের রড ক্রয় করে সেগুলো দিয়ে সূক্ষ্ম ও উৎকর্ষ সুঁই তৈরি করি, যেগুলো যেকোনো সময় বাড়িতে ব্যবহারের উপযোগী’ লেখা রয়েছে। একেই এখন পর্যন্ত সংরক্ষিত প্রাচীনতম বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনের একমাত্র উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

সং রাজবংশের সময়ে তৈরি তামার পাতে লেখা একটি বিজ্ঞাপন; পঞ্চম থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীর ইউরোপের অধিকাংশ মানুষই পড়তে জানত না। তাই সেসময় পণ্য বা সেবার সাথে সম্পর্কযুক্ত প্রতীক বা সেগুলোর ছবি কিংবা চিহ্ন ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন প্রচারের কাজটি করা হতো। এছাড়াও স্ট্রিট কলাররা নির্দিষ্ট পণ্য বা সেবার গুণ বর্ণনা করে গীতিকবিতা গেয়ে বেড়াতো। এ ধরনের গীতিকবিতাগুলো ত্রয়োদশ শতাব্দীতে প্রকাশিত কবিতার বই  Les Crieries de Paris বা ‘স্ট্রিট ক্রাইস অফ প্যারিস’-এ উল্লেখ রয়েছে।

প্রিন্ট মিডিয়ার আগমনের পর বিজ্ঞাপন

আধুনিক মুদ্রণের ইতিহাসের শুরুটা প্রায় ২২০ খ্রিষ্টাব্দের আগে, চীনের হান সাম্রাজ্যের সময়কালে। ‘ওড-ব্লক প্রিন্টিং’ নামে সর্বাধিক পরিচিত মুদ্রণের এই পদ্ধতিটির মাধ্যমে সেসময় রেশমের কাপড়ে বিভিন্ন রকমের লেখা, ছবি ও নকশা ছাপা হতো। নবম শতাব্দীর শেষের দিকে মুদ্রণের এই পদ্ধতিটির বিস্তৃতি বাড়তে থাকে। কাপড়, স্ট্যাম্পসহ নানা ক্ষেত্রে ব্যবহারের পাশাপাশি কাগজেও এর পুরোপুরি ব্যবহার শুরু হয়। সর্বপ্রথম সম্পূর্ণ মুদ্রিত ‘ডায়মন্ড সূত্র’ নামের বইটি প্রকাশিত হয় ৮৬৮ সালে।


সর্বপ্রথম সম্পূর্ণ মুদ্রিত বই ‘ডায়মন্ড সূত্র';

কাগজে মুদ্রণের ইতিহাসের সাথে বিজ্ঞাপনের ইতিহাসের সংযোগ তৈরি হয় পঞ্চদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের পর। ধারণা করা হয়, ইংরেজ ব্যবসায়ী, কূটনীতিজ্ঞ ও লেখক উইলিয়াম ক্যাক্সটন কর্তৃক লেখা প্রথম ইংরেজি প্রিন্টেড বইয়ের প্রচারের লক্ষ্যে ১৪৭৭ সালের দিকে কাগজে মুদ্রিত বিজ্ঞাপন ছাপা হয়। বিজ্ঞাপনের এই পদ্ধতিটি পরবর্তীতে হ্যান্ডবিল আকারে জনপ্রিয়তা পায়।


উইলিয়াম ক্যাক্সটন কর্তৃক লেখা প্রথম ইংরেজি প্রিন্টেড বইয়ের প্রচারের লক্ষ্যে হ্যান্ডবিল আকারে ছাপানো বিজ্ঞাপন;
ষোড়শ শতাব্দীর শুরুতে ভেনিসে সাপ্তাহিক সরকারি গ্যাজেট প্রকাশ হওয়া শুরু হয়। ধীরে ধীরে সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশের ধারণাটি ইতালি, জার্মানি, হল্যান্ড এবং ব্রিটেনেও বেশ দ্রুততার সাথে ছড়িয়ে পড়ে। বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনের ধারণাটিও সে সময় থেকেই জনপ্রিয়তা লাভ করতে থাকে।

অন্যদিকে মুদ্রণের অগ্রগতি খুচরা বিক্রেতা এবং ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানিগুলোকে হ্যান্ডবিল এবং ট্রেড কার্ড ছাপানোর সুযোগ করে দিয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, ১৬৭০ সালের লন্ডনের খুচরা ব্যবসায়ী জনাথন হোল্ডারের কথাই ধরা যাক। প্রচার-প্রসারের লক্ষ্যে তিনি তার দোকানে আসা প্রত্যেক ভোক্তাকে সব রকমের পণ্যের নাম ও দাম সম্বলিত একটি প্রিন্টেড ক্যাটালগ প্রদান করতেন। বর্তমানে এ ধরনের ক্যাটালগের ব্যবহার বেশ স্বাভাবিক হলেও সেসময় হোল্ডারের এই আবিষ্কার খুচরা বিক্রেতাদের জন্য অপ্রয়োজনীয় ব্যয় এবং খারাপ ব্যবসায়িক অনুশীলন হিসেবে ধরা হতো।

১৭০২ সালে ব্রিটেনে প্রকাশিত হয় প্রথম দৈনিক পত্রিকা ‘দ্য ডেইলি কোরান্ট’। তবে এর মাত্র দুই বছর পরেই, ১৭০৪ সালে ব্রিটিশ নর্থ আমেরিকায় প্রকাশিত হওয়া আরেকটি পত্রিকা ‘দ্য বোস্টন নিউজ-লেটার’-এর মাধ্যমে ইতিহাসের প্রথম সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপনটি ছাপানো হয়। এটি নিউ ইয়র্কের লং আইল্যান্ডের অস্টার-বে’তে একটি জমি বিক্রয় সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন ছিল। সে সময় থেকে দৈনিক পত্রিকা নির্ভর বিজ্ঞাপন ব্যবস্থার প্রচলন বেশ ভালোভাবে শুরু হলেও বিজ্ঞাপনের ইতিহাসে নতুন চমক আসতে প্রায় পঁচিশ বছর লেগেছিল। 

দ্য বোস্টন নিউজলেটার;

১৭২৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা পুরুষ বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন কর্তৃক প্রকাশিত ‘দ্য পেনসিলভেনিয়া গ্যাজেট’-এ একটি আলাদা পৃষ্ঠাই রাখা হয় বিজ্ঞাপন প্রচারের লক্ষ্যে। এতে করে বেশ অনেকটা লভ্যাংশ বিজ্ঞাপন থেকে আসে বিধায় পত্রিকার দাম কমিয়ে ফেলা হয়। ফলে পত্রিকার কাটতিও বেশ বেড়ে যায়। বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের এরূপ সুদূরপ্রসারী চিন্তা যে অন্যান্য সকল দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক পত্রিকাগুলো দারুণভাবে গ্রহণ করেছিল, তা বর্তমানের পত্রিকাগুলোর দিকে তাকালেও বোঝা যায়।

বিজ্ঞাপনী সংস্থার আগমন

বর্তমানে বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলো মূলত ক্রিয়েটিভ এজেন্সি হিসেবেই বেশি পরিচিত। এধরণের সংস্থাগুলো মূলত একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রদানকৃত সেবা বা পণ্যগুলোর সৃজনশীল ব্র্যান্ডিং থেকে শুরু করে নানান প্লাটফর্মে প্রচার-প্রসারের লক্ষ্যে কাজ করে যায়। সংস্থাগুলো কোনো প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বিভাগ হতে পারে, কিংবা স্বাধীন ফার্ম হিসেবেও কাজ করে যেতে পারে। বর্তমানে এগুলো বেশ চোখে পড়লেও আজ থেকে প্রায় দু’শত বছর পূর্বে হাতেগোনা কয়েকটি বিজ্ঞাপনী সংস্থার অস্তিত্ব ছিল।

ইতিহাসের প্রথম বিজ্ঞাপনী সংস্থাটি শুরু হয় ১৭৮৬ সালের লন্ডনে, উইলিয়াম টেইলরের হাত ধরে। তাছাড়া প্রথম দিককার বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলোর প্রতিষ্ঠাটা হিসেবে ফ্ল্যাট স্ট্রিট, লন্ডনের জেমস ‘জেম’ হ্যোয়াইট, লন্ডন গ্যাজেটের অফিসার জর্ন রেয়নেল’য়ের নামও উঠে আসে। তবে ইউরোপের বাইরে, আমেরিকা, কানাডা এবং পুরো পৃথিবীব্যাপী বিজ্ঞাপনী সংস্থার অগ্রদূত হিসেবে ‘ভলনে বি. পালমার’কে স্মরণ করা হয়।


বিজ্ঞাপনী সংস্থার অগ্রদূত, ভলনে বি. পালমার;

পালমার ১৮৪০ খ্রিষ্টাব্দে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে তার বিজ্ঞাপনী সংস্থা ‘ভলনে পালমার এজেন্সি’ শুরু করেন। ‘Adland: A Global History of Advertising’ বইয়ে পালমারকে আমেরিকা এবং কানাডার বিভিন্ন শহর এবং প্রাদেশিক অঞ্চলগুলোর সবচাইতে ভালো পত্রিকাগুলোর অনুমোদিত প্রতিনিধি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তিনি বিজ্ঞাপনদাতা এবং প্রকাশকগুলোর মধ্যে মধ্যস্থতা অবলম্বন করতেন।

তবে মাত্র দুই বছরের মধ্যে পালমারের বিজ্ঞাপনী সংস্থার মডেলে পরিবর্তন আসে। ১৮৪২ সালে তিনি ফিলাডেলফিয়ায় অফিস খুলে বসেন। সে সময় তিনি বিভিন্ন পত্রিকায় অল্প দামে বিজ্ঞাপনের পাতা ক্রয় করে সেগুলো বিজ্ঞাপনদাতাদের নিকট বেশি দামে বিক্রয় শুরু করে। ক্লায়েন্টের প্রয়োজন মোতাবেক বিভিন্ন লে-আউট, আর্টওয়ার্ক তৈরি করে দিলেও পালমার মূলত অ্যাড-স্পেস ব্রোকার হিসেবেই বেশি পরিচিতি পায়। পালমারের এই বিজ্ঞাপনী সংস্থার মডেলটি পরবর্তীতে বেশ জনপ্রিয় এবং অনুকরণীয় হয়ে উঠে। তবে বর্তমানে ক্রিয়েটিভ এজেন্সির ধারণাটি নিয়ে আসে ২১ বছর বয়েসি ‘ফ্রান্সিস ওয়েল্যান্ড আয়ার’।


ফ্রান্সিস ওয়েল্যান্ড আয়ার; 

১৮৬৯ সালে ফ্রান্সিস তার বাবার নামে নিউইয়র্কে ‘এন. ডব্লিউ. আয়ার এন্ড সন’ নামের একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন, যেটি রিলেজিয়াস উইকলির প্রতিনিধি হিসেবে কাজ শুরু করে। তবে তার বিচক্ষণতা এবং সৃজনশীলতাকে পুঁজি করে বেশ দ্রুতই তিনি ভলনে পালমার এজেন্সি সহ আরো কয়েকটি বড় বিজ্ঞাপনী সংস্থা করায়ত্ত করে বসেন। ফ্রান্সিস পত্রিকার বিজ্ঞাপন পাতা ক্রয়-বিক্রয় ছাড়াও বিভিন্ন ক্লায়েন্টের জন্য ব্র্যান্ডিং করা সহ আকর্ষণীয়, সৃজনশীল বিজ্ঞাপন তৈরিতে লোকবল কাজে লাগান। মূলত বর্তমানে এজেন্সিগুলোর ‘ক্রিয়েটিভ টিম’য়ের ধারণাটি ফ্রান্সিসের এজেন্সি থেকেই এসেছে। De Beers, AT&T, ইউ. এস. আর্মি সহ আরো অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানের বিখ্যাত স্লোগান তৈরির কাজটিও এন. ডব্লিউ. আয়ার এন্ড সন’-এর।

বিলবোর্ড বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপনের মূল কাজই যেহেতু কোনো একটি নির্দিষ্ট পণ্য, ইভেন্ট বা সেবার দিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা, সেহেতু উনিশ শতাব্দীর শেষের দিকে কোম্পানিগুলো নানানভাবে তাদের বিজ্ঞাপন প্রচারের পথ খুঁজতে লাগলো। সে সময় থেকেই মূলত বিজ্ঞাপন প্রচারে বিলবোর্ডের প্রচলন পুরোপুরিভাবে শুরু হয়। প্রথম নথিভুক্ত বড় আকারের বিলবোর্ডটি জারেড বেল কর্তৃক তৈরি। হাতে আঁকা ৯X৬ আঁকারের বড় বিলবোর্ডটি ১৮৩৫ সালের নিউইয়র্কে একটি সার্কাস শো’র জন্য তৈরি হয়েছিল।


বাংলায় বিজ্ঞাপন

বাংলায় বিজ্ঞাপনের ইতিহাস লিখতে গিয়ে বাংলা ভাষায় সর্বপ্রথম বিজ্ঞাপন প্রচার শুরু হয় কখন, তা না জানালে যেন পুরো লেখাটিই অসম্পূর্ণই থেকে যায়।

বর্তমানে সংরক্ষিত বাংলা ভাষায় প্রথম বিজ্ঞাপনটি প্রকাশিত হয় ইংরেজি পত্রিকা ‘কলকাতা ক্রনিকল’য়ে, ১৭৭৮ সালে। পঞ্চানন কর্মকার কর্তৃক প্রকাশিত বিজ্ঞাপনটি একটি বাংলা ব্যাকরণ বিষয়ক বইয়ের ছিল। সে সময়ে, বা তারো আগে অন্য কোনো মাধ্যমে বাংলায় বিজ্ঞাপনের প্রচার-প্রসার চললেও তার কোনো প্রমাণ বর্তমানে সংরক্ষিত নেই। তবে এ দিকটায় পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগতে প্রায় শত বছর লেগে গিয়েছিল।

পত্রিকায় প্রকাশিত প্রথম বাংলা বিজ্ঞাপন; 

১৮৪০ সালের দিকে বাংলাদেশে পরীক্ষামূলকভাবে চায়ের চাষ শুরু হয়। বছর দশেকের মধ্যে রফতানির লক্ষ্যে চা চাষে গুরুত্ব দেওয়া শুরু করে ব্রিটিশ সরকার। নতুন নতুন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ শুরু করে সদ্য জন্ম নেওয়া এই সেক্টরে। ১৮৫৪ সালে সিলেটের মালনীছড়ায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া চা বাগানের হাত ধরেই শুরু হয় চায়ের বাণিজ্যিক উৎপাদন। নতুন এই পানীয়কে জনসমাজে পরিচিত করতেও নেওয়া হয় নানান পদক্ষেপ। তার মধ্যে বিজ্ঞাপন যে অন্যতম প্রচার-প্রসারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল তার বলার অপেক্ষা রাখে না।


বিজ্ঞাপনগুলোতে চায়ের নানান ঔষধি গুণাবলি বর্ণনা সহ বিজ্ঞান সম্মত উপায়ে চায়ের প্রয়োজনীয়তা বোঝানো হতো;
সে সময় লঞ্চঘাট, রেলস্টেশন সহ নানান জনবহুল স্থানে চায়ের বিজ্ঞাপন ফলক দেখা যেত। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া শুরু করে ‘অসম চা কোম্পানি’। বিজ্ঞাপনগুলোতে চায়ের নানান ঔষধি গুণাবলি বর্ণনা সহ বিজ্ঞান সম্মত উপায়ে চায়ের প্রয়োজনীয়তা বুঝানো হতো। মানুষের মাঝে বিজ্ঞাপনগুলো কী পরিমাণ প্রভাব ফেলেছিল, তা আজকের চা নামক পানীয়টির কিংবদন্তি হয়ে ওঠাই প্রমাণ করে।

বিজ্ঞাপনের স্বর্ণযুগ

ইতিহাস ও সংস্কৃতির গতিপথ পালটে দিয়েছিল এমন আবিষ্কারগুলোর কথা আলোচনা হলে সন্দেহাতীতভাবে রেডিও এবং টেলিভিশনের নাম উঠে আসবে। বিজ্ঞাপনের স্বর্ণযুগের সূচনা যে এই দুই উদ্ভাবনের ফলেই শুরু হয়েছিল তা-ও বলার অপেক্ষা রাখে না।

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে রেডিওর জনপ্রিয়তা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। দামে সস্তা হয়ে উঠায় মাত্র বিশ বছরের মধ্যে এই যন্ত্রটি প্রায় প্রত্যেক ঘরেই বিনোদনের মাধ্যম হয়ে উঠে। সঙ্গীত, প্রাত্যহিক সংবাদ, অডিও নাটক, কী নেই এতে! ঘরোয়া বিনোদনের দুর্দান্ত উৎসটি খুব দ্রুতই মার্কেটারদের দৃষ্টি আকর্ষযন করে।

২৮ আগস্ট, ১৯২২। নিউ ইয়র্কের WEAF রেডিও স্টেশন। হোস্ট এইচ.এম. ব্লাকওয়েল ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে পুরো দশ মিনিট কুইনের জ্যাকসন হাইটের হওথোর্ন কোর্ট অ্যাপার্টমেন্টে সব রকমের সুবিধাসহ ভাবনা-চিন্তাহীন কী ধরনের জীবন উপভোগ করা যাবে, তা বর্ণনা করেন। আর ঠিক এভাবেই পাবলিক রেডিওতে ইতিহাসের প্রথম রেডিও বিজ্ঞাপন সম্প্রচারিত হয়। সে সময় সরাসরি বিক্রয়ের জন্য বিজ্ঞাপন প্রচার নিষেধ ছিল বিধায় বিজ্ঞাপন প্রচারে ব্লাকওয়েল এই পদ্ধতি ব্যবহার করেন। আর দশ মিনিটের বিজ্ঞাপনটি প্রচার করতে কুইনস-বরো কর্পোরেশনের খরচ হয় পঞ্চাশ ডলার।


সাবান, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা পণ্যগুলোর বিজ্ঞাপন এ ধরণের রেডিও আওয়ারগুলোতে প্রচার করা হতো; 
মাত্র দশ বছরের মধ্যে প্রায় প্রত্যেকটি রেডিও স্টেশনই বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন প্রচার শুরু করে। এমনকি রেডিওর কিছু কিছু অনুষ্ঠান নানান ধরনের কোম্পানির স্পন্সরে সম্প্রচার করা হতো। বিশেষ করে নারীদের টার্গেট করে সোপ অপেরা, উইকলি রেডিও ড্রামা সে সময় বেশ প্রচলিত স্পন্সরড অনুষ্ঠান ছিল। সাবান, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা পণ্যগুলোর বিজ্ঞাপন এ ধরণের রেডিও আওয়ারগুলোতে প্রচার করা হতো।

টেলিভিশন বিজ্ঞাপন

আধুনিক সময়ের সংস্কৃতিতে টেলিভিশনের প্রভাব অনস্বীকার্য। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে প্রায় কয়েক দশক ধরে মানুষের ঘরে ঘরে কেন্দ্রীয় বিনোদনের জায়গা দখল করে নিয়েছিল এই চারকোণার যাদুর বাক্সটি। বিনোদনের সাথে সাথে বিজ্ঞাপনের চেহারা পাল্টে দেওয়ার কাজেও টেলিভিশনের বড় ভূমিকা ছিল, তা ইতিহাসের পাতা ওল্টালেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। 

প্রথম দিকে টিভি কমার্শিয়াল প্রচারে আমেরিকা সরকারের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ১৯৩৯-এর দিকে NBC পরীক্ষামূলক-ভাবে প্রক্টর এন্ড গ্যাম্বল, জেনারেল মিল সহ আরো কয়েকটি কোম্পানির বিজ্ঞাপন বার্তা আকারে সম্প্রচার করে। যদিও একই ধরণের চর্চার জন্য ১৯৩০-এর দিকে ম্যাসাচুসেটস ভিত্তিক টিভি নেটওয়ার্ক W1XAV’কে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৪১ সালের মে মাসে ফেডারেল কমিউনিকেশন কমিশন থেকে WNBT সহ দশটি টেলিভিশন নেটওয়ার্কে বিজ্ঞাপন প্রচারের অনুমতি দেওয়া হয়। শুরু হয় বিজ্ঞাপনের নতুন আরেকটি যুগ।


ষাটের দশকের কোকাকোলার টিভি কমার্শিয়াল; Image Source: All Classic Video Youtube Chanel
প্রথম বাণিজ্যিক টেলিভিশন বিজ্ঞাপনটি সম্প্রচারিত হয় ১৯৪১ সালের পহেলা জুলাই, বর্তমানে WNBC নামে পরিচিত NBC’র মালিকানাধীন টেলিভিশন নেটওয়ার্ক WNBT’তে। নিউ ইয়র্কের এবেটস মাঠে ব্রুকলিন ডজার্স এবং ফিলাডেলফিয়া ফিলিজের মধ্যকার বেসবল খেলা সম্প্রচার শুরুর ঠিক আগে।

ঘড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘বুলোভা ওয়াচ’য়ের বিজ্ঞাপনটি মাত্র নয় সেকেন্ডের জন্য অন এয়ারে ছিল। আমেরিকার ম্যাপের মাঝে একটি বুলোভা ঘড়ি, তারো মাঝে লেখা ‘বুলোভা ওয়াচ টাইম’। ঘড়িতে তখন আটটা বাজে। বিজ্ঞাপনের শেষের চার সেকেন্ডের ভয়েস ওভারে বলা হয়েছিল, ‘আমেরিকা রানস অন বুলোভা টাইম’; অর্থাৎ, ‘বুলোভার সময়ে চলছে আমেরিকা।’ বিজ্ঞাপনটি প্রচারে বুলোভা ওয়াচের খরচ হয়েছিল নয় ডলার; সম্প্রচারের জন্য চার ডলার এবং স্টেশন চার্জ পাঁচ ডলার।



পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের ফলে বিজ্ঞাপন ইন্ডাস্ট্রির সাথে টেলিভিশন বিজ্ঞাপন প্রায় থমকে দাঁড়িয়েছিল। যুদ্ধ চলাকালীন প্রায় সবগুলো কোম্পানিই তাদের বিজ্ঞাপনগুলোতে স্বদেশ প্রেমের চিত্র তুলে ধরতো। জাত্যভিমান তাদেরকে এমনভাবে পেয়ে বসেছিল যে, রফতানিযোগ্য পণ্যের বিজ্ঞাপনের থিমও হয়ে উঠেছিল জাতিবাদী ভাবধারা নির্ভর।


দ্বিতীয় যুদ্ধের সময় একটি ফিল্ম ও প্রজেকশন কোম্পানির বিজ্ঞাপন; 
তবে পঞ্চাশের পরে টেলিভিশন বিজ্ঞাপন আবার তার নিজস্ব ছন্দে ফিরে আসে। ছোট-বড় সব ধরনের পণ্য ও সেবা প্রচার-প্রসারে টেলিভিশন কমার্শিয়াল হয়ে উঠে নতুন এক ট্রেন্ড। স্পন্সর্ড প্রোগ্রামের পরিমাণও বাড়তে থাকে হুহু করে। নীতি নির্ধারকেরা বিজ্ঞাপনের মানদণ্ড বজায় রাখতে তৈরি করে নানা ধরণের নতুন নিয়ম-নীতি।

ঠিক এভাবেই বিংশ শতাব্দী শেষের সময়টা টেলিভিশনই বিজ্ঞাপন প্রচারের কাজটিতে কর্তৃত্ব ফলিয়ে গেছে। যদিও তা ছিল ইন্টারনেট প্রযুক্তি মানুষের নাগালে পৌঁছনোর আগপর্যন্তই।

আর হ্যাঁ, ১৯৬৭ সালে প্রচারিত বাংলাদেশে প্রথম টেলিভিশন বিজ্ঞাপনটি ছিল ৭০৭ ডিটারজেন্ট সাবানের।

শুরুর শেষ

২০১৭ সালের PQ Media'য়ার হিসেব অনুযায়ী ঐ সময়ের বিজ্ঞাপন ইন্ডাস্ট্রিটির মূল্য ছিল প্রায় ১.২ ট্রিলিয়ন ডলার। দিন দিন এই মূল্য আরও দ্রুত গতিতে ফুলে-ফেঁপে উঠছে। বর্তমানে পার্সোনাল কম্পিউটার ভিত্তিক স্মার্টফোন, স্মার্ট টেলিভিশন, ইন্টারনেট ভিত্তিক নানান প্রযুক্তির বদৌলতে বিজ্ঞাপনগুলো আরও বেশি ব্যক্তি পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে। 

দৈনিক সংবাদপত্র, বিলবোর্ড, রেডিও, টেলিভিশনের মতো প্রচারের ট্র্যাডিশনাল মাধ্যমগুলো হারিয়ে যাচ্ছে, নয়তো বিবর্তিত হয়ে নতুন প্রযুক্তিগুলোর সাথে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে। বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া, অনলাইন স্ট্রিমিং, অনলাইন পত্রিকা সহ বিজ্ঞাপন প্রচারের হাজারটা মাধ্যম রয়েছে। তা অবশ্য অন্য আরেক সময়ের আলোচনা। তবে বিজ্ঞাপন যে মানুষের ব্যক্তিগত সত্ত্বার অংশ হয়ে উঠছে, শিল্প-সংস্কৃতিতে কৌশলে নিজের স্থান পাকাপোক্ত করে নিচ্ছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

আধুনিক বিজ্ঞাপন মিডিয়া - সফল ব্যবসা উন্নয়ন চাবিকাঠি

কোন ব্যাপার না যতই নেতিবাচক বিজ্ঞাপনের ভোক্তা মনোভাব ছিল না, তবে এটা করা হয়েছে এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় যে উৎসগুলি থেকে ভোক্তাদের প্রদত্ত নির্দিষ্ট পণ্য ও সেবা প্রাপ্যতা সম্পর্কে জানতে এক হিসাবে বিরাজমান হয়েছে। টেলিভিশনে rollers বিজ্ঞাপন সবচেয়ে কার্যকর ফর্ম, কিন্তু সবচেয়ে ব্যয়বহুল। না যে প্রচারণা এটা কেনার সামর্থ্য পারেন, এবং এটি সমস্ত বিদ্যমান সংস্থাগুলো বাজারে একটি টেলিভিশন বিন্যাস ফ্রেম তথ্য মিটমাট করা অসম্ভব।

এ প্রসঙ্গে, বিজ্ঞাপনদাতা ক্রমাগত দক্ষ ও কম ব্যয়বহুল উপায় তাদের পণ্য প্রচার করতে সচেষ্ট হয়। এই প্রয়োজনীয়তা সম্পূর্ণরূপে মুদ্রণ ও স্যুভেনির পণ্য, অফিসে প্রধানত ব্যবহৃত মিলিত হয়। কোম্পানী লোগো, নোটবুক, মগ, সেইসাথে ত্রৈমাসিক ক্যালেন্ডার সঙ্গে এই স্টেশনারি।

কারণ তারা প্রদান বাসস্থানের জন্য আরো সুযোগ গ্রাহকদের পাঠানো উচিত এই তালিকায় ত্রৈমাসিক ক্যালেন্ডার, বিশেষ স্থান আছে। উপরন্তু, ক্যালেন্ডার এই ধরনের অফিস সবচেয়ে জনপ্রিয়। যেহেতু তিন মাস দেখিতে একই সময়ে হয় তারা ব্যবহার করতে আরও বেশি সুবিধাজনক, এবং ছাড়া ঘন পৃষ্ঠা বাঁক পরিকল্পনা ও প্রতিবেদন, তফসিল মিটিং এবং ব্যবসা ঘটনা করতে পারেন। এটা যেমন ক্যালেন্ডারের একটি ঘন ব্যবহার ছিল, যদিও, যে এটি তার চোখের সামনে সর্বদা, বিজ্ঞাপন উপর রিটার্ন বৃদ্ধি। অফিস কর্মী পণ্যের বিজ্ঞাপন যা এক বছরের জন্য তার সামনে ছিল প্রয়োজন হবে, সম্ভাবনা বেশি এটা বলা যেতে পারে যে প্রথম জিনিস তিনি কোম্পানিতে কল করবে।

অফিস দর্শক, যারা খুব প্রায়ই কিছু বা কেউ বিবেচনা করে এবং সাবধানে সবকিছু যে দৃষ্টি তাদের মাঠে পায়, ক্যালেন্ডারে বিজ্ঞাপন তথ্য সহ পরীক্ষা করার জন্য অপেক্ষা আছে সম্পর্কে ভুলবেন না।

ত্রৈমাসিক ক্যালেন্ডারে বিজ্ঞাপন ভেরিয়েন্ট বিভিন্ন হতে পারে। আমরা লোগো সহ আপনার কোম্পানীর রং ব্র্যান্ড নকশা সীমিত করতে পারে। এই ধরনের বিজ্ঞাপনগুলি উদ্দেশ্য ব্র্যান্ড সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বাজারের ইমেজ একত্রীকরণ হয়। পণ্য বা পরিষেবা তাদের একটি সম্পূর্ণ বিবরণ প্রয়োজন উন্নীত করা, ইমেজ হতে পারে, এমনকি মূল্য।

ত্রৈমাসিক ক্যালেন্ডার উপরের বিজ্ঞাপন আলোকে প্রিন্ট মিডিয়ার আধুনিক বিজ্ঞাপন সবচেয়ে জনপ্রিয় ও কার্যকর ধরনের এক হিসাবে স্থান হতে পারে। উপরন্তু, এটা অপেক্ষাকৃত কম খরচে একটি উচ্চ প্রভাব রয়েছে।

বিজ্ঞাপনের সেকাল একাল

একালে ‘বিজ্ঞাপন’এর কথা অমৃত সমান – শেষ হবার নয় । বিনোদনের জন্য টেলিভিষন খোলার জো নেই, রেডিওতে কান পাতার উপায় নেই, আর খবরের কাগজের প্রথম পৃষ্ঠাটাতেও পাতাজোড়া বিজ্ঞাপন। ‘দুধে জল মেশানো না জলে দুধ মেশানো’ সেটা বোঝা যেমন মুস্কিল হয়, তেমনই বোঝা যায় না ‘খবরের সঙ্গে বিজ্ঞাপন না বিজ্ঞাপনের সঙ্গে কিছু খবরের টুকরো’। এখন তো গণিকা, কলগার্লরাও দেহ বিক্রির বিজ্ঞাপনেও আমাদের অভ্যস্ত করিয়ে দিয়েছে। নারী-সঙ্গ ভোগের হাতছানি। যার নাম সাহসী সম্পর্ক স্থাপন বা ‘বোল্ড রিলেসন’। একালের কথা থাক, সে কালের কথা বলি ।

সুপ্রাচীন কালে মিশরে, যখন কাগজ আবিস্কার হয়নি, তখন গাছের ছালে লিখে পন্য বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া হত । প্রাচীন ভারতে শিলালেখ’এ যে রাজনৈতিক বা ধর্মীয় নির্দেশ লেখা হত তাও তো বিশেষ জ্ঞাপন বা বিজ্ঞাপন । তো, সেই শিলালিপিবার্তা থেকে এই আধুনিক যুগে দেওয়ালে সাঁটা হাঁপানি কিংবা যৌনব্যাধি নিরামময়ের দাওয়াইএর বিজ্ঞাপন পর্যন্ত দীর্ঘ পরিক্রমা ।

লন্ডনের টমাস জে ব্যারাটকে  আধুনিক বিজ্ঞাপনের জনকের মান্যতা দেওয়া হয় । সেটা উনিশ শতকের কথা । ব্যারাট কাজ করতেন লন্ডনের পীয়ার্স সাবান কোম্পানীতে । পীয়ার্স সাবানের ছবি দিয়ে বিজ্ঞাপনের স্লোগান লিখেছিলেন  “সুপ্রভাত, তুমি কি পিয়ার্স সাবান ব্যবহার করেছো” ? দীর্ঘকাল সেই সাবান নির্মাতারা এই বিজ্ঞাপনটি দিতেন । বস্তুত ব্যারাট পীয়ার্স সাবানকে অভিজাত ও মধ্যবিত্ত শহুরে মানুষের কাছে দারুণ জনপ্রিয় করে ছিল । আজও পীয়ার্স সাবানের কথা প্রবীণেরা জানেন । শুধু কি বিজ্ঞাপনের স্লোগান রচনা যেনা, পিয়ার্স সাবানকে জনপ্রিয় করার জন্য বার্ষিক ‘মিস পিয়ার্স’প্রতিযোগিতাজেব্রান্ড এমব্যাসাডোর নিয়োগ করা, সেলিব্রিটিদের দিয়ে পণ্যের প্রচার এ সবই ব্যারাটের মাথা থেকেই বের হয়েছিল । লিটল ল্যাংট্রি নামে এক ব্রিটিশ হোটেল গায়িকাকে দিয়ে তাদের সাবানের বিজ্ঞাপন করিয়েছিলেন ১৮৯১এ । ঐ ব্রিটিশ গায়িকাই প্রথম অর্থের বিনিময়ে পণ্যের বিজ্ঞাপন করা সেলিব্রিটি যা ছিল ব্যারাটের অবদান ও মস্তিষ্ক প্রসুত ।

প্রায় একই সময়ে, ১৯০০ নাগাদ ভারতে গ্রামফোন বা কলের গান চলে আসে । দম দেওয়া আর চোং লাগানো গ্রামফোনে গালার চাকতিতে ধ্বনিবদ্ধ গান শোনা । সে এক বিস্ময় বটে ! সেই সময় গ্রামফোন কোম্পানীর একটা বিজ্ঞাপন খুব লোকপ্রিয় হয়েছিল এবং এখনও প্রবাদের মত হয়ে আছে – “সুখী গৃহকোণ, শোভে গ্রামফোন”। এমন রুচিসম্মত স্লোগান কে রচনা করেছিলেন তা জানা যায় না ।

১৮৩৬এ ফরাসী সংবাদপত্র ‘লা প্রেসে’ প্রথম সংবাপত্রে বিজ্ঞাপনের প্রচলন শুরু করে । সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দেওয়ার পথ খুলে যাওয়ায় কয়েক বছরের মধ্যে মুদ্রিত বিজ্ঞাপনের অভূতপূর্ব বাজার তৈরী হয়ে গেলো এবং একাধিক বিজ্ঞাপন এজেন্সি গঠিত হয়ে গেলো । পণ্য বিক্রয়ের প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ের শুরু অতয়েব হয়ে গেলো । এদেশে তখন এ’সবের বালাই থাকার কথা নয়, ছিলোও না। দেশের পণ্যই নেই তো বিজ্ঞাপন কে দেবে !

কিন্তু বিজ্ঞাপন ছিল । ১৮২৫-২৬এর মধ্যে এদেশে সংবাদপত্র এসে যায় । ১৭৬৫তে দেওয়ানী পাওয়ার পর ইংরাজ শাসন জাঁকিয়ে বসতে শুরু করে । নানান পেশায় ভাগ্যান্বেষি ইংরেজ মুচি, ধোপা, নাপিত, ফেরিওয়ালারাও ভাগ্যান্বেষণে কলকাতায় আস্তানা গাড়ে, লুটেপুটে খাওয়া শুরু হয়েছে যে ! সেই সময়ে ইংরাজি সংবাদ পত্রে তাদের বিজ্ঞাপন থাকতো । গৃহভৃত্য চেয়ে, পুরাতন আসবাবপত্র বিক্রি করতে চেয়ে, কিংবা কর্মপ্রার্থি হয়ে সেসব বিজ্ঞাপন দেওয়া হত । এই বিজ্ঞাপনগুলি থেকে সেকালের কলকাতার সমাজজীবনের একটা বিশ্বাসযোগ্য পরিচয় পাওয়া যায় । ১৭৮৪ সালের ক্যালকাটা গেজেটের একটা বিজ্ঞাপন ছিল মেসার্স উইলিয়াম এন্ড লী একটি ঘোড়া বিক্রি করবেন ৩০০ সিক্কা টাকায় । ১৮০১ সালে শ্রীরামপুরের জনৈক আব্রাহাম একটা বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন যে তার স্ত্রী কাউকে না বলে বাড়ি থেকে পালিয়ে গেছেন । তিনি যদি কোথাও কোন ধার দেনা করেন, তার দায় আব্রাহামের নয় । বোঝ কান্ড ! বৌ পালিয়েছে, তার খোঁজ পাওয়ার বিজ্ঞাপন নয়, সে যদি টাকা ধার করে তার দায় ঐ ব্যক্তির নয় । ১৭৯১ সালের ২৮শে এপ্রিল এক সাহেব একটা অভিনব বিজ্ঞাপন দিলেন এই মর্মে যে তিনি ‘কলকাতার রাস্তায় যত্রতত্র ঘুরে বেড়ানো ঘোড়াগুলির বংশবৃদ্ধি করাতে চান ।  ইচ্ছুক ঘোড়া-মালিকরা তার বিজ্ঞাপনের খরচটা মিটিয়ে দিলেই তিনি কাজ শুরু করবেন’ । বোঝা গেল সেই আদি কলকাতার ইংরেজদের শুধু টাকা রোজগারের ধান্দা ছাড়া আর কিছুই মাথায় আসতো না । [সূত্রঃ ‘শহর কলকাতার ইতিবৃত্ত’ / বিনয় ঘোষ ]

সর্বকালেই বিজ্ঞাপন সমাজের প্রতিচ্ছবি। ‘পাত্র-পাত্রী’র বিজ্ঞাপনের মধ্যদিয়ে সেই সমাজের সমস্যার একখন্ড ছবি পাই, কর্মপ্রার্থি, কর্মখালির বিজ্ঞাপনে সেই সময়ের বেকার সমস্যার ধরণ বুঝতে পারি । যেমন বুঝতে পারি, ইদানিং বিজ্ঞাপিত তরুণ-তরুণীর ‘সাহসী সম্পর্ক’ স্থাপনের বিজ্ঞাপনগুলি থেকে সেই সমাজের অধঃপতনের সর্বনাসা সংকেত । পঞ্চাশ বছর আগের পাত্র-পাত্রীর বিজ্ঞাপনের একটি বাক্য আমার আজও মনে আছে। বিজ্ঞাপনদাতা পাত্রীর গুন জানিয়ে লিখছেন পাত্রী উচ্চমাধ্যমিক পাশ, “স্টেটসম্যান পড়িয়া ইংরাজি শিখিতেছে”।

বাংলায় বিজ্ঞাপনের চল হল অনেক পরে । সেই আদিপর্বে কে কিসের বিজ্ঞাপনই বা দেবে! ধনী অভিজাত বাবুদের ব্যবহার্য সব জিনিসই আসতো লন্ডন,ম্যাঞ্চাষ্টার,প্যারিশ থেকে । ১৮১৮ থেকে বাংলা সংবাদপত্র প্রকাশিত হতে থাকে । দুবছর আগে গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য ব্যবসায়িক ভিত্তিতে প্রথম সচিত্র বাংলা বই প্রকাশ করলেন – ভরতচন্দ্রের ‘অন্নদা মঙ্গল’। তিনিই প্রথম বাংলা বইএর দোকান করেন কলকাতায়। তখনও রেল চলেনি, টেলিগ্রাফ হয়নি, কল-কারখানার ধোঁয়া ওড়েনি, উন্নত ডাকব্যবস্থার পত্তনও হয়নি। কিন্তু কলকাতার গ্রন্থনগরী হয়ে ওঠার সূত্রপাত ঘটে গিয়েছিল চিৎপুর, শিয়ালদহ। গরাণহাটা, শাখারিটোলায় অনেক ছাপাখানা স্থাপন আর বই প্রকাশের মধ্য দিয়ে । তাদের ক্যানভাসাররা বই ফেরি করতো সেটাই তাদের বইয়ের বিজ্ঞাপন হত। ১৮১৮ সালের ২৬শে ডিসেম্বর মার্সম্যান সম্পাদিত তখনকার ‘সমাচার দর্পণ’পত্রিকায় প্রকাশিত একটা বিজ্ঞপ্তীতে জানা যায় “কলিকাতার শ্রীযুক্ত রামমোহন রায় সহমরণের বিষয়ে এক কেতাব করিয়া সর্বত্র প্রকাশ করিয়াছেন । তাহাতে অনেক লিখিয়াছে কিন্তু স্থুল এই লিখিয়াছে যে, সহমরণের বিষয় যথার্থ বিচার করিলে শাস্ত্রে কিছু পাওয়া যায় না” । এটাই বাংলা ভাষায় প্রথম বিজ্ঞাপন এমন তর্কে না গিয়েও নিশ্চিতভাবেই বলা যায় এটা বাংলা ভাষার বিজ্ঞাপনের আদি নমুনা। তখন বাংলা গদ্য হাটতে শেখেনি, সবে হামাগুড়ি দিচ্ছে। চিৎপুর-গরাণহাটা অঞ্চলের ছাপাখানার প্রকাশকরাই হাজার হাজার বাঙালির ঘরেঘরে বই পৌছে দিতেন, আমাদের পরিশীলিত সাহিত্যবোধে যতই আমরা তাকে বটতলার সাহিত্য বলে বিদ্রুপ করিনা কেন, বাঙালির সঙ্গে বইএর পরিচয় ঘটিয়েছিল এই বটতলার সাহিত্যই । বাংলা বিজ্ঞাপন শিল্পের আঁতুড়ঘরও এই বটতলা্র পুস্তক প্রকাশকরা । ১৯শতকের মধ্যভাগ থেকেই মুদ্রিত পঞ্জিকার প্রকাশ শুরু হবার ফলে বাংলা বিজ্ঞাপনশিল্পের বিপুল বৈচিত্র্য এলো । বাংলার ঘরে ঘরে পঞ্জিকা আবশ্যিক ছিল । পঞ্জিকার পৃষ্ঠায় তাই রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদি ভক্তিগ্রন্থের সঙ্গে সর্বদুঃখহরা আংটি, ফুলকপির বীজ, গুপ্তরোগ চিকিৎসার হদিস, নানান সব বিচিত্র ও সচিত্র বিজ্ঞাপন মানুষের ঘরে ঘরে পৌছে গেল ।

বৃটিশ আমলে বাঙালির ব্যবসা ও তার প্রচারের একটা প্রবণতা বেশ কৌতুককর । ভারতীয় ব্যবসায়ীরা ভাবতেন তাদের ব্যবসার নাম ইংরেজদের নামের মত হলে লোককে বেশি আকর্ষণ করা যাবে । তাই দ্বারকানাথ ঘোষ (পন্ডিত জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের দাদু) প্যাডেল বা বসে বাজানোর হারমোনিয়াম প্রবর্তন করে কোম্পানীর নাম রাখলেন ডোয়ার্কিন । দ্বারকানাথ হয়ে গেল ‘ডোয়ার্কিন’ । আশুতোষ ঘোষের বিখ্যাত চা’এর ব্যবসা হল ‘এ টশ এন্ড সন্স’ । আমূল মাখনের পূর্বে খুব জনপ্রিয় ছিল পলসন বাটার আমরা ভুল করতাম বিদেশী কোম্পানী মনে করে । আদতে এর মালিক ছিলেন আদুলজি দালাল নামে এক পার্শি ব্যবসায়ী, তাঁর ডাকনাম ছিল পলি । ব্যস কোম্পানীর নাম হয়ে গেল পলসন ।

পণ্যের বিজ্ঞাপনে সেই পণ্যের টার্গেট ক্রেতাকে প্রলুব্ধ করার মনস্তত্ব পণ্য বিক্রেতার থাকেই, তা দোষের নয়। কিন্তু প্রলুব্ধ করার জন্য রুচিহীন ভাষা ও অনৈতিকতার যে প্রাবল্য এখন দেখা যায় তা সহ্য করা মুস্কিল । পঞ্চাশ, ষাট, সত্তর দশকের বিজ্ঞাপন নির্মাণে এই রুচিশীলতা ও নৈতিকতা বজায় ছিল । অনেক নামি লেখকরা পণ্যের বিজ্ঞাপনের ভাষা রচনা করতেন । সত্যজিৎ রায় তাঁর কর্ম জীবন শুরু করেছিলেন বিজ্ঞাপন রচনার কাজ করে । পূর্ব রেলওয়ে তাদের বিজ্ঞাপণে রবীন্দ্রনাথের একটা কবিতা ব্যবহার করত – “এ প্রাণ রাতের রেলগাড়ি, দিল পাড়ি......” । ১৯৪৭এ স্বাধীনতা লাভের পরের দিন ১৬ই অগস্ট ইংরাজি কাগজ ‘স্টেটসম্যানের প্রথম পৃষ্ঠায় একটা হাতঘড়ির বিজ্ঞাপন দেখছি, হাতঘড়ির ছবি দিয়ে তিনটি মাত্র শব্দ খরচ করা বিজ্ঞাপন ‘ইট’স অ্যান ওমেগা’। অতি সংক্ষিপ্ত স্লোগান, কিন্তু অব্যর্থ । একালে এমন বিজ্ঞাপনে নির্ঘাত কোন সুবেশা তন্বির ছবি থাকতো !

৫৪/৫৫ সালের কথা মনে আছে কাঁচি মার্কা সিগারেটের একটা বিজ্ঞাপন – রেল প্ল্যাটফর্মে সঙ্গের মালপত্রের ওপর বসে একজন সিগারেটে সুখটান দিচ্ছে আর ট্রেন তার সামনে দিয়ে হুশ করে চলে যাচ্ছে। বিজ্ঞাপনে এই রকম বুদ্ধির ছাপ ছিল। বালক বয়সে বিজ্ঞাপনটায় বেশ মজা পেতাম, সিগারেটে সুখটান দেওয়ার জন্য লোকটি ট্রেনটা ধরতে পারলোনা বলে। কাঁচিমার্কা সিগারেটের কি মাহাত্ম! ট্রেন যায় যাক, সিগারেটে সুখটানটা থাক !

বেশি দিনের কথা নয় । পুরাতন পত্রিকা ঘাঁটতে গিয়ে পেলাম ১৯৭১এ ‘হিন্দুস্থান স্টীল’এর একটা বিজ্ঞাপন । বিজ্ঞাপনের ভাষা এই রকম - “ভাষা ও ভঙ্গিমায় জীবনের প্রতিভাস । শিল্পকৃতি মানবিকতার সম্পদ”। ১৯৬১তে হিন্দি সিনেমা ‘নজরানা’র বিজ্ঞাপনের ভাষা – “হৃদয়ের কষ্টিপাথরে যাচাই করা প্রেমের অর্ঘ্য”... । প্রখ্যাত পুস্ত প্রকাশক এ মুখার্জী কোম্পানী বিজ্ঞাপন দিত ‘আমরা বই ছাপি না, বিষয় ছাপি’। বিজ্ঞাপন রচনায় এই ভাষা এখন আর কোথায় ! এখনতো ভাষায় শৈল্পিক স্পর্শ তো দূরের কথা, এখন অদ্ভুত জগাখিচুড়ী ভাষায়  পণ্যের বিজ্ঞাপনে ছেয়ে গেছে – ‘ঠান্ডার নতুন ফান্ডা’ ‘ইন্ডিয়া কেয়ার করবে’ ‘নো ওয়েটিং যুগ যুগ’ ইত্যাদি অদ্ভুতুড়ে ভাষা ।

বিজ্ঞাপন শুধু নীরেট তথ্য নয় সামাজিক ইতিহাসের উপাদানও । বিজ্ঞাপন থেকে সমকালীন সমাজের চেহারাটাও বোঝা যায়, সমাজ ও জীবনের বিবর্তনের ইতিহাস রচনায় নানান উপাদান পাওয়া যায় বিজ্ঞাপন থেকে । ১৮৭৫এর ২৭শে জানুয়ারির একটা বিজ্ঞাপন। ভ্রমণকারীদের থাকা-খাওয়া ও রাত্রিবাসের জন্য ।
‘হোম ফর ট্রাভেলার্স এন্ড আদার্স
রেটস – বোর্ড আন্ড লজিং পার ডে – ১টাকা
 সিঙ্গল মিল -- ৮ আনা
এ বেড ফর দি নাইট -- ৮ আনা
এইচ মেন্ডেস, প্রোপ্রাইটার নং – ৮, বৌ বাজার
এই বিজ্ঞাপন থেকে আমরা বুঝতে পারি দেড়শো বছর আগে একজন সম্পন্ন ভ্রমণকারীর দৈনিক জীবনধারণের মান কেমন ছিল ।
আরএকটি বিজ্ঞাপন ১৯০৫এর । যা থেকে আমরা জানবো ১৯০৫ নাগাদ কলকাতায় মোটর গাড়ির চল হয়েছে । বিজ্ঞাপনটি এই রকম –
“রোভার কার, দি ভেরি লেটেস্ট ইন কার
৮ এইচ পি সিঙ্গল সিলিন্ডার, আরটিলারি হুইলস
 প্রাইস ৩৬০০ টাকা নগদ”
জানলাম ইংল্যান্ড থেকে আমদানি করা একটা মোটর গাড়ির দাম ১৯০৫ এ ছিল ৩৬০০ টাকা । (তথ্যসূত্র – ‘কলকাতা শহরের ইতিবৃত্ত’- বিনয় ঘোষ)
এই সব বিজ্ঞাপন থেকে তৎকালীন সমাজের বিশ্বাসযোগ্য ছবি পাচ্ছি । আবার একুশ শতকের এই সময়ে অভিজাত প্রভাতী সংবাদপত্রে যখন দেদার বিজ্ঞাপন ছাপা হয় “ সুন্দরী সেকসি নারীসঙ্গ উপভোগ করুন” তখন আজকের সমাজটা কোন পাঁকে তলাচ্ছে তার সংকেতও পেয়ে যাই ।
       
বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে টার্গেট উপভোক্তাদের মাথা চিবিয়ে খাবার প্রক্রিয়ার আঁতুড় ঘর যে আমেরিকা এখন আর এতে কারো সংশয় নেই। প্রায় একশ’বছর আগে এই প্রক্রিয়ার সূচনা হয়েছিল আমেরিকায়। ‘মানুষের অর্থনৈতিক আচরণ ও তার অবচেতনে থাকা উপভোগ ও ক্রয়ের স্পৃহাকে লক্ষ্যবস্তু করার তত্ব’ প্রয়োগ করা শুরু করলো ওখানকার বিজ্ঞাপন কোম্পানীগুলো । বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে উপভোক্তাকে প্রলুব্ধ করার এই তত্বের উদ্গাতা যে সে লোক নয়, বিশ্বখ্যাত মনবিজ্ঞানি সিগমন্ড ফ্রয়েডের ভাইপো এডওয়ার্ড বেরনাভস,আমেরিকা যাকে বলে আধুনিক বিজ্ঞাপন শিল্পের উদ্ভাবক ।

বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে উপভোক্তাকে প্রলুব্ধ করার এই মডেলই সর্ব দেশে অনুসৃত হয়ে আসছে । ১৯৫০এর দশক থেকে আমেরিকায় রেডিও ও টেলিভিষনে  বানিজ্যিক বিজ্ঞাপনের চল হওয়ার পর থেকে বড় বড় মনবিদরা নানান পদ্ধতি উদ্ভাবন করে চলেছেন । আমাদের দেশে রেডিওতে বানিজ্যিক বিজ্ঞাপন চালু হয় রেডিওর বিবিধ ভারতীর অনুষ্ঠানে ১লা নভেম্বর ১৯৬৭ থেকে ।
       
এ কালের বিজ্ঞাপনের কথা বলতে ইচ্ছা হয় না। এ দেশে নব্বইএর দশক থেকে বিশ্বায়নের সর্বগ্রাসী থাবা আমাদের সংস্কৃতি, রুচি, ভাষা আর মূল্যবোধের সবটুকুই লুটে নিয়েছে। ‘রক্তকরবী’ নাটকে অধ্যাপক ও নন্দিনীর কথোপকথনের অংশ মনে পড়ে । অধ্যাপক নন্দিনীকে বলছেন “আমরা যে মরা ধনের শবসাধনা করি। তার প্রেতকে বশ করতে চাই। সোনার তালের তাল-বেতালকে বাঁধতে পারলে পৃথিবীকে পাব মুঠোর মধ্যে” । পন্যায়ন আর ভোগবাদ পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় পাওয়ার রাস্তা বাৎলে দিয়েছে আমাদের । এখন আর ‘সেনকোর অলঙ্কার আমার অহংকার’ নয় হীরা চাই । তাই হীরা কেনার লোভ দেখানো বিজ্ঞাপন । এখন দেহ ব্যবসার বিজ্ঞাপনও অভিজাত বাংলা সংবাদ পত্রে বাধাহীন প্রকাশ হয়ে চলে ।

হাতের মুঠোয় পৃথিবীকে ধরা – মহা পূণ্যবান
একালের বিজ্ঞাপন-কথা অমৃত সমান ।  - ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়//

বিজ্ঞাপনের ভিড়ে নৈতিকতা ও বাস্তবতা

সাংবাদিকের ডায়েরিএ কেমন সামর্থ্য, যা কখনো হয় না? উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা আর হতাশার এ কোন বাংলাদেশ! দেশের ‘কুকুর’ ধরাতেই উন্নতি আগে পেট, তারপর করোনা আমি বর্ণবাদী, আপনিও কিন্তু তাই! গায়ের রঙ চাপা, ময়লা না পরিষ্কার? বাংলাদেশের যে লজ্জা পাকিস্তানেরও নেই শতবর্ষের শেখ মুজিব যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা আর নেপোয় মারে দই পক্ষপাতদুষ্ট ছায়াযুদ্ধের ফাঁদ শ্রমকেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা কবে হবে? চাকরির বাজারে কোথায় দাঁড়িয়ে নারী কোন অনুভূতির দেশ গড়বে আওয়ামী লীগ? দমনের রাজনীতি ও বাংলাদেশে সাংবাদিকতা‘গো ব্যাক পিএম’ শ্লোগানে কী প্রমাণ করছি? সিলটি-লন্ডনি আর প্রবাসীদের ‘পলিটিক্স’ক্রিকেটারদের মানসিক শক্তি বাড়ানোর উপায় কী? অনভিজাত দর্শকের চোখে ক্রিকেটের অভিজাত সংস্করণ অ্যামেরিকান প্রফেসরের কবিরাজি সাংবাদিকতা : স্বপ্ন ও বাস্তবতা সাংবাদিকতা কি এখন ফেসবুক, ইউটিউব নির্ভর? জার্মান ট্রেনের বদনাম বাড়ছে, তবে...সত্যিকারের গণপরিবহন হয়ে উঠুক রেল জার্মানিতে সরকার বদলালেও প্রশাসন বদলায় নাশিক্ষকের উপাচার্য হওয়া কেন জরুরি? মরণোত্তর দেহদান এত জটিল!মরণোত্তর দেহদান: সংকোচ দূর হোকভ্রান্ত আদর্শকে ভাঙতে হবে আদর্শ দিয়ে একটি ভঙ্গুর মানচিত্রের গল্প স্বকীয়তা হয়ে উঠুক সৌন্দর্যের প্রতীক আমি কী পরবো, ঠিক করবে কে? সংসদে দেশ ও জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয় আলোচনা হয় না বাংলাদেশে কার্যকর সংসদ এবং সুশাসনের স্বপ্ন দুর্নীতিই কি ইউরোপে চরমপন্থিদের বাড়বাড়ন্তের কারণ? দুর্নীতির আমি দুর্নীতির তুমি রাইড শেয়ারিং যত বাড়বে, ততই মঙ্গল বাংলাদেশে ‘রাইড শেয়ারিং' প্রতারণা টিকে থাকুক ফেসবুক, বাড়ুক রক্তদান রক্ত সংগ্রহে ‘দ্য গুড ভ্যাম্পায়ার্স' অভিজাতদের কবল থেকে মুক্ত হোক ক্রিকেট

বিজ্ঞাপন - শব্দটি শুনলে আমাদের প্রত্যেকের মাঝেই বিরক্তি আর আকর্ষণ মিলে একটি মিশ্র অনুভূতির সৃষ্টি হয়৷ কোনো টিভি অনুষ্ঠানের মাঝে এই জিনিসটা হাজির হলে আমাদের বিরক্তির সীমা থাকে না৷ কারণটা জানা, এখন অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে বিজ্ঞাপন নয়, যেন বিজ্ঞাপনের ফাঁকে ফাঁকে অনুষ্ঠান দেখতেই বেশি অভ্যস্ত আমরা!

শুধু টেলিভিশনেই না, বর্তমানে পত্রিকাগুলোর সামনের-পেছনের পৃষ্ঠায় বিশাল অংশজুড়ে বিজ্ঞাপন থাকা স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ ভেতরের পাতায়ও যেখানে সেখানে থাকে অসংখ্য বিজ্ঞাপন৷ মাঝে মাঝে তো বিজ্ঞাপনের অভিনব কৌশলে সংবাদ থেকে তাকে আলাদা করতেও বিপাকে পড়তে হয়৷ আর অনলাইনের তো কথাই নেই৷ ওয়েবসাইটের মূল আধেয়র চারিদিকে থাকার পাশাপাশি যেখান সেখান দিয়ে হুট করে হাজির হচ্ছে বিজ্ঞাপন৷

তবে বিরক্তির পাশাপাশি বিজ্ঞাপন আমাদের বিভিন্ন পণ্য ও সেবা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় (এবং ক্ষেত্রবিশেষে প্রচুর অপ্রয়োজনীয়) তথ্য এনে দেয়, যা আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে৷ এছাড়াও অনেক বিজ্ঞাপনই আমাদের কাছে ভালোমন্দ নানারকম বার্তা তুলে ধরে, যা আমাদের আকৃষ্ট করে, আমাদের আবেগ আর লুকানো চাহিদাকে নাড়া দেয়৷ আবার কিছু কিছু বিজ্ঞাপনের শিল্পগুণ আমাদের মুগ্ধ করে৷ সেসব বিজ্ঞাপন আমরা গণমাধ্যমের অন্যান্য আধেয়র মতোই সাদরে গ্রহণ করি৷

বিজ্ঞাপন একটি মার্কেটিং বা বিপণন কৌশল, যার মাধ্যমে যে কোনো পণ্য বা সেবা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য সম্ভাব্য গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়৷ বিজ্ঞাপনের অন্যতম উদ্দেশ্য পণ্য বা সেবা সম্পর্কে জানিয়ে মানুষের চাহিদাকে বাড়িয়ে দেয়া, যেন আগে প্রয়োজন থাকুক বা না থাকুক, বিজ্ঞাপনটির মুখোমুখি হওয়ার পর তিনি সেটি কেনার প্রয়োজন বোধ করেন৷

রং দিয়ে একজন নারী তাঁর শরীর ঢাকছেন৷ ফ্যাশন ব্র্যান্ড লিভাইসের একটি বিজ্ঞাপনের ছবি এটি৷ তুলেছেন ক্রিস্টোফে গিলবার্ট নামের এক ফটোগ্রাফার৷ তাঁর এই সিরিজের ছবিগুলোতে নারীকে ফ্যাশনের চেয়ে কামোদ্দীপক করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বলে অভিযোগ আছে৷ তবে ভিন্নমতও আছে৷

আধুনিক বিজ্ঞাপনের জনক বলে খ্যাত টমাস যে ব্যারেট বলেছেন, ‘‘রুচি পালটায়, ফ্যাশন পালটায়, আর বিজ্ঞাপন নির্মাতাদের এর সঙ্গে তাল মিলিয়েই পালটাতে হবে৷ এমনটা নয় যে প্রতিবারই নতুন আইডিয়া পুরনো আইডিয়ার চেয়ে ভালো হবে৷ কিন্তু তা অবশ্যই পুরনোটার চেয়ে ভিন্ন এবং তা বর্তমান রুচির সঙ্গে মিলবে৷'' আবার ২০ শতকের শুরুর দিকে প্রখ্যাত মার্কিন মনোবিদ ওয়াল্টার ডি স্কট এবং জন বি ওয়াটসন বলেছিলেন, মানুষের মৌলিক আবেগগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে অনেক বেশি কার্যকর বিজ্ঞাপন তৈরি সম্ভব৷

কিন্তু সেই অভিনবত্ব দেখাতে আর মানুষের আবেগকে ব্যবহার করতে গিয়ে বিজ্ঞাপন যদি হয়ে পড়ে নীতিবিরুদ্ধ?

এমনটাই যেন চোখে পড়ছে বেশি৷ বিজ্ঞাপনে পণ্য বা সেবা সম্পর্কে বাড়িয়ে বলাটা একটা বৈশ্বিক ট্রেন্ড৷ কিন্তু যে জিনিসে যা হয় না তা বলে, এমনকি শিশুখাদ্য বা পানীয় নিয়েও মিথ্যা তথ্য দিয়ে পণ্য বিক্রির প্রবণতা মনে হয় এই উপমহাদেশে বেশি লক্ষ্যণীয়৷ বাচ্চাদের হেলথ ড্রিংকগুলোর কোনোটি শিশুকে তিনগুণ দ্রুত লম্বা করছে, কোনোটি এক কাঠি বেড়ে একই সঙ্গে ‘টলার, স্ট্রংগার ও শার্পার' করছে, কোনোটি আবার এসবের কাছে না গিয়ে শিশুকিশোরদের স্ট্যামিনা বাড়ানোর দাবি করছে৷ সবগুলো বিজ্ঞাপনেই এই পুষ্টিগুণগুলো ‘বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত' দাবি করা হলেও হেলথ ড্রিংকের এ জাতীয় বিজ্ঞাপন পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে নিষিদ্ধ৷ কেন? কথায় বলে, বুদ্ধিমানের জন্য ইশারাই নাকি যথেষ্ট৷

গণমাধ্যম সম্পর্কে থাকা হরেক তত্ত্বের কোনোটি বলে, গণমাধ্যমে মানুষ যা দেখে বা শোনে তা-ই বিশ্বাস করে৷ আবার কোনো তত্ত্ব অনুসারে, মানুষ গণমাধ্যম থেকে সেই কনটেন্ট বা আধেয়টাই গ্রহণ করে যেটা সে গ্রহণ করতে চায়৷ কিন্তু এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, গণমাধ্যমের আধেয় যেমন সমাজকে প্রতিফলিত করে, তেমনি আধেয়টির দর্শক-শ্রোতাকে কমবেশি প্রভাবিত করার সুযোগ থাকবেই, যার প্রতিফলন হবে সমাজের ওপর৷ বিজ্ঞাপনও এমনই একটি আধেয়৷ ফলে বিজ্ঞাপনে প্রচারিত ভুল বার্তা উদ্বেগের কারণ হওয়াটাই স্বাভাবিক৷

একটা ছোট্ট উদাহরণ দেই: কোনো এনার্জি ড্রিংকের বিজ্ঞাপনে নাকি বলেছিল, এটা খেলে ব্রেইন খোলে, সতেজ থাকে৷ তাই এক উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি কারও নিষেধ না শুনে চোখের সামনেই তাঁর মাত্র স্কুলজীবন শুরু করা বাচ্চা ছেলেটাকে এনার্জি ড্রিংক কিনে খাওয়ানো শুরু করলেন! টানা কয়েক মাস বোঝানোর পর ধীরে ধীরে তিনি নিমরাজি হয়ে এ কাজ বন্ধ করলেন ঠিকই৷ কিন্তু ততদিনে বাচ্চাটাকে সেই এনার্জি ড্রিংক আসক্তির মতো ধরে ফেলেছে৷

বিজ্ঞাপনের ভুল বার্তা বা মিথ্যা তথ্যের প্রভাবের এমন অসংখ্য দৃষ্টান্ত আমাদের চারপাশে রয়েছে৷ ওপরের উদাহরণটি শারীরিক স্বাস্থ্য বিষয়ক৷ মানসিক ও সামাজিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর অগুণতি ভুল বার্তা আমরা প্রতিনিয়ত বিজ্ঞাপন থেকে হজম করছি৷ একটা মেয়েকে ভালো বিয়ে থেকে শুরু করে ভালো চাকরি, সবকিছুর জন্য ফর্সা হতে হবে৷ শ্যামবর্ণের মেয়েদের কপালে চাকরিও নেই – বিজ্ঞাপনের এমন ধারণা চোখ বুজে বিশ্বাস করে আমরা আয়ুর্বেদিক থেকে শুরু করে টিউবলাইট-লেজারলাইট ফর্মুলাযুক্ত রং ফর্সাকারী ক্রিম নিজে মাখছি, অন্যকে মাখার পরামর্শ দিচ্ছি৷ এখন তো পুরুষদের জন্যও আলাদা ফেয়ারনেস ক্রিম আছে৷ যাক, নেতিবাচকভাবে হলেও অন্তত এই একটি দিক থেকে লৈঙ্গিক ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছেন কতিপয় বিজ্ঞাপন নির্মাতা!

শুধু তাই নয়, স্থূলতা মানেই হাস্যকর, অপমানজনক - নিজের পণ্য বা সেবা বিক্রি করতে এমন বার্তা দেয়া বিজ্ঞাপনকে হাস্যরসের ছলে স্বাগত জানাচ্ছি আমরা৷ এর মধ্য দিয়ে দিনকে দিন বর্ণবাদ ও বাহ্যিক রূপকে যোগ্যতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আমরা ‘এগিয়ে' চলেছি৷

বিজ্ঞাপন ও ক্রোড়পত্র নীতিমালায় সংক্ষেপে বলা থাকলেও বিজ্ঞাপন বিষয়ক নৈতিক বাধ্যবাধকতা নিয়ে মূলত আলোচনা রয়েছে ‘জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা, ২০১৪'-তে৷ সেখানে বলা হয়েছে, বিজ্ঞাপনে এমন কোনো বর্ণনা বা দাবি প্রচার করা যাবে না, যাতে শিশু থেকে শুরু করে যে কোনো বয়সের জনগণ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রতারিত হতে পারে৷ বিজ্ঞাপনে নোংরা ও অশ্লীল শব্দ, উক্তি, সংলাপ, জিঙ্গেল, গালিগালাজ ইত্যাদিও থাকা যাবে না৷ শুধু তাই নয়, দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ, শিশু-কিশোর ও যুবসমাজের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করে এবং সংস্কৃতিকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে এমন কোনো বিজ্ঞাপনও প্রচার করা যাবে না৷ পাশাপাশি শ্রমের মর্যাদা ক্ষুন্ন হয় এমন ধারণাকেও বিজ্ঞাপন থেকে বাদ দিতে হবে৷ শারীরিক ও মানসিক অক্ষমতা বা দৈহিক আকার-বর্ণকে কেন্দ্র করে কোনো বিজ্ঞাপন প্রচার নিষেধ৷

শিশুদের চরিত্র গঠনে সুশিক্ষা প্রদানের মতো বার্তা দেয়ার কথাও বলা হয়েছে নীতিমালায়৷ শিশুর নৈতিক, মানসিক বা শারীরিক ক্ষতি করতে পারে এমন কিছু বিজ্ঞাপনে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না৷ যে কোনো খাদ্য বা পানীয়ের বিজ্ঞাপনে এর স্বাস্থ্যগত প্রভাব স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতেও এই নীতিমালায় নির্দেশ দেয়া হয়েছে৷ নারী, শিশু-কিশোর, বৃদ্ধের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টিকারী আধেয়র পাশাপাশি সংশ্লিষ্টতা ছাড়া বিজ্ঞাপনে নারীর অহেতুক ও দৃষ্টিকটু উপস্থাপনও পরিহার করতে বলা হয়েছে৷ এমনি আরো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট উল্লেখ করা হয়েছে জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালার চতুর্থ অধ্যায়ে৷

কিন্তু এর কয়টা মানা হচ্ছে আমাদের দেশে?


পণ্যের গুণাগুণ নিয়ে অতিরঞ্জন তো আছেই, তার সঙ্গে মানুষের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যকে নানাভাবে হেয় করে পণ্য বিক্রির চেষ্টা চলছে৷ একদিকে কোনো আঞ্চলিক ভাষাকে নিয়ে বিদ্রুপ করা হচ্ছে, অন্যদিকে কখনো নারীকে দেখানো হচ্ছে লোভী হিসেবে৷ কারণ বিশেষ ব্র্যান্ডের ফ্রিজ না কিনে না দিলে সংসারই করবেন না তিনি! আবার এত বছরের প্রেমিককে ছেড়ে শুধু পারফিউমের ঘ্রাণে পাগল হয়ে অন্য পুরুষের পেছনে ছুটলেন আরেক নারী৷ বিজ্ঞাপনের এই আইডিয়াটি অবশ্য সারা পৃথিবীতেই বহুল ব্যবহৃত৷

আবার দেশীয় তারকাদের প্রমোট না করে বিদেশি বিজ্ঞাপনগুলোকেই ডাবিং করে প্রচার করা হচ্ছে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে, যা খুবই বিরক্তিকর৷ অনেক ক্ষেত্রেই এই বিজ্ঞাপনের থিমগুলো আমাদের সংস্কৃতির সাথে মেলে না৷ বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বিজ্ঞাপনে এটা অনেক বেশি দেখা যায়৷ অবশ্য হুবহু একই বিজ্ঞাপনে শুধু মানুষগুলো পালটে দেয়া বিজ্ঞাপনও আমরা দেখছি৷

শুধু কি তাই? ‘একটু চাপ দাও, আসল মজা নাও…আসল মজা ভেতরে'; ‘চলো ঝাঁকাই'… বাচ্চাদের ক্যান্ডি থেকে শুরু করে ফ্রুট জুসের বিজ্ঞাপনে ব্যবহার হচ্ছে এমনই নানা দ্ব্যার্থবোধক স্লোগান ও জিঙ্গেল৷ একইভাবে ‘তৃষ্ণায় দু'হাত বাড়ালে তোমায় পাওয়া যায়…' কোমল পানীয়র এই বিজ্ঞাপনে পানীয়টা হাতে থাকলেও তৃষ্ণার্ত পুরুষ ব্যক্তিটি হাত বাড়ালেন চারপাশে নাচতে থাকা নারীর দিকেই৷ নারীর পণ্যায়নের এ যেন আক্ষরিক দৃষ্টান্ত৷ রয়েছে এমনই নানা অসঙ্গতি; যার ফলে বিজ্ঞাপনগুলো অনেক সময় চটকদার হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেখানে মনে রাখার মতো কোনো বার্তা বা সারবস্তু থাকছে না৷

কিন্তু এটা স্বীকার করতেই হবে, বিজ্ঞাপনে বার্তার অস্তিত্ব আগের চেয়ে ম্লান হলেও আবারও তা ভিন্ন আঙ্গিকে নিজেকে মেলে ধরার চেষ্টায় আছে৷ বেশকিছু বিজ্ঞাপনে শৈল্পিকভাবে উপস্থাপিত বার্তাগুলো আমাদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়, আমাদের আবেগ আর বিবেককে আলোড়িত করে৷ বিজ্ঞাপন আগের চেয়েও ভিন্নধর্মী ও পরিশীলিত কিছু ধারণা তুলে ধরছে আমাদের সামনে; যা আমাদের একটি মুহূর্তের জন্য হলেও ভাবতে শেখায়৷ কে জানে, আমাদের চিন্তাধারাও হয়তো বদলে দেয় ভেতর থেকে৷

উদাহরণ হিসেবে বলা যায় একটি টেলিকম কোম্পানির বিজ্ঞাপনে শাশুড়িকে পুত্রবধূর স্কুটি শেখানো বা মায়ের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ফোন কিনে নিয়ে যাওয়ার কথা৷ অথবা স্কুলপড়ুয়া বাচ্চাটির প্রিয় ললিপপটি পথশিশুকে দেয়ার গল্পটা৷ চুলের তেল বিক্রয়কারী একটি প্রতিষ্ঠানের নারী দিবস উপলক্ষে নির্যাতনবিরোধী সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপনটি দেশ ছাড়িয়ে সমাদৃত হয়েছে বিশ্ব অঙ্গনে৷ ‘আর এক চুলও ছাড় নয়' স্লোগানের বিজ্ঞাপনটি স্তব্ধ করে দিয়েছিল গোটা বিশ্বকে৷

এমনই কিছু আইডিয়া সময়ের সাথে আরো উন্নত হয়ে বাংলাদেশের বিজ্ঞাপনকে নিয়ে যাচ্ছে শিল্পের পর্যায়ে৷ আর এরই পথ ধরে সব ছাড়িয়ে সংশ্লিষ্টরা দেখছেন বাংলাদেশের বিজ্ঞাপন শিল্পের ইতিবাচক, উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন৷ তানজিমা এলহাম বৃষ্টি, সাংবাদিক//

নতুন বিজ্ঞাপন এজেন্সীর যাত্রা শুরু

নতুন বিজ্ঞাপন এজেন্সী ফ্রাব অ্যাডভার্টাইজিং -এর যাত্রা শুরু করল সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা কমিটি।  নির্বাহী পরিচালক হিসেবে যোগদান করেছেন মো. র...